শিরোনাম


সালেহিন চৌধুরী শুভঃ
সুনামগঞ্জবাসীর ব্যানারে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার দাবিতে শহরের জিরো পয়েন্টে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মূলত সদর আসনের সংসদ সদস্যের উদ্যোগেই সমাবেশটি হয়েছে। ৬ লেন দাবি হিসেবে চমকপ্রদ ও আশাবাদী হবার মতো। জেলাবাসীর উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে দ্বিমত করার অবকাশ নেই। দাবি আদায় হোক এ আশাবাদ ব্যক্ত করে কয়েকটি বিষয়ের বিশ্লেষণের প্রয়াস পাচ্ছি।
অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, আয়োজকরা দ্রুত মানুষের আবেগ কাজে লাগানোর সহজ ইস্যু হাতছাড়া করতে চাননি। তাই কি দাবি ও কেন দাবি আয়োজকদের কাছেও ¯পষ্ট হবার আগেই সমাবেশের ডাক দেয়া হয়েছে। সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ তার ফেসবুকে লিখেছিলেন “সম্প্রতি একনেকে ঢাকা – সিলেট সড়ক ৪ লেন অনুমোদিত হয়ছে”। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় তার দাবি উল্লেখ করে প্রকাশিত খবরেও ৪ লেনের উল্লেখ করা হয়। আবার সমাবেশে তিনি বলছেন ৬ লেন অনুমোদিত হয়েছে এবং সুনামগঞ্জ পর্যন্ত ৬ লেন দাবি করছেন। আসলে পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্য হাতে না পেয়েই তড়িঘড়ি করে আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়েছে। তাই আন্দোলনের যৌক্তিকতা ও বাস্তবতা ভাবারও অবকাশ হয়নি।
দেখা যাক প্রকল্পটি আসলে কি? এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্ক, বিমসটেক করিডোর, সার্ক করিডোরসহ আঞ্চলিক সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত হবার উদ্দেশ্য “সাসেক ঢাকা – সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন” প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। সরকার যোগান দিবে ৩ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা বাকি ১৩ হাজার ৬১২ কোটি টাকা ঋণ আকারে দিবে এডিবি। প্রকল্পের পটভূমিতে বলা হয়, “চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগে ভৌগোলিকভাবে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ। এ কারণে আঞ্চলিক উন্নয়ন বিবেচনায় বাংলাদেশের সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে সহায়তা দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এরমধ্যে ঢাকা – সিলেট মহাসড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে ও বিমসটেক করিডোরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
এই প্রকল্পে সিলেট বিভাগের অন্য ৩ জেলা যুক্ত এই যুক্তিতে সুনামগঞ্জ জেলাকে যুক্ত করার আদৌ কি কোন সুযোগ আছে? আরো মৌলিক প্রশ্ন আছে। এখন পর্যন্ত সিলেট হয়ে সুনামগঞ্জে প্রবেশ করতে হলেও নিকট ভবিষ্যতে সিলেট আর সুনামগঞ্জের প্রবেশদ্বার থাকবে না। সুনামগঞ্জ জেলার সাথে সারা দেশের যোগাযোগ হবে আউশকান্দি-সুনামগঞ্জ সড়ক হয়ে। শুধু সিলেটের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক ব্যবহার করা হবে। কমবেশি ১০ হাজার কোটি টাকা (উঁচু ভূমিতে থাকা ঢাকা-সিলেট সড়কে কিলোমিটার প্রতি প্রায় ৭৭ কোটি টাকা ব্যয় হবে, সিলেট – সুনামগঞ্জ সড়কে খরচ হবে প্রায় দ্বিগুণ) ব্যয়ে শুধুমাত্র ১ জেলার সাথে যোগাযোগের জন্য ৬৭ কিলোমিটার সড়ক ৬ লেনে উন্নীত করা আদৌ কি যুক্তিসংগত? রাষ্ট্রীয় তহবিলের বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করে জেলার সাথে সারাদেশের যোগাযোগের প্রধান সড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার দাবি নয় কেন?
অন্য জেলাগুলো যুক্ত যে কারণে আমরা বঞ্চিত সেই একই কারণে। আসলে সুনামগঞ্জ হাজারো বছর ধরে ভৌগোলিকভাবেই প্রান্তিক বা সর্বশেষ জেলা। যখন আসামে ছিল তখনও সুনামগঞ্জ পশ্চিম প্রান্তের সর্বশেষ মহকুমার ছিল। কামরূপ বা প্রাগজোতিশপুর রাজ্য যখন ছিল তখনও এ অঞ্চল প্রান্তিক ছিল। আর এই প্রান্তিকতা যেমন বঞ্চনার কারণ আবার এটি কাটিয়ে উঠার মধ্যেই রয়েছে উন্নয়নের মূল সূত্র। কুমিল্লা বা টাঙ্গাইলের মতো দেশের মধ্যাঞ্চলের জেলাসমূহের উন্নয়নের জন্য আন্দোলন করতে হয় না। যেকোন প্রকল্প রাজধানী থেকে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে এসব জেলার উপর দিয়েই যায়। প্রযুক্তি বা পণ্যের নতুন মডেলের ক্ষেত্রেও তাই হয়। তাই মধ্যাঞ্চলীয় জেলা এগিয়ে যায়, প্রান্তিক জেলা পিছিয়ে পড়ে।
সুনামগঞ্জের এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হবার সম্ভাবনা কম। ধরে নিলাম বিরোধী দলীয় হুইপের নেতৃত্বে আন্দোলন সফল হবে। শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি ছাড়া ৬ লেন হবে হাওরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আইয়ুবের আমলের ব্রিজগুলোর মতই। বিপরীতে শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশ ঘটলে চাহিদার প্রয়োজনে ৮ লেনের মহাসড়কও হতে পারে। পশ্চাদভূমি (পেছনের অঞ্চল বা যেসব এলাকা নির্ভর করে, যেমন চট্টগ্রাম বন্দরের পশ্চাদ ভূমি সারাদেশ) বিহীন সুনামগঞ্জ জেলায় কি ব্যাপকভাবে শিল্পায়ন সম্ভব? স্বাভাবিকভাবে সম্ভব নয়। কারণ আমদানি-রপ্তানির বন্দর দূরে থাকায় পরিবহন খরচ বেশি পড়বে। তবে বাংলাদেশের সাথে কানেক্টিভিটিতে উদগ্রীব হয়ে থাকা ভারতের ৮ রাজ্য ও চীনের একটি অংশকে পশ্চাদভূমি হিসেবে সুনামগঞ্জে ব্যাপক শিল্পায়ন পরিকল্পনা করা যেতে পারে। হাওরে শিল্পায়নের জায়গা না থাকলেও সীমান্তবর্তী পাদদেশীয় উঁচু ভূমি শিল্পায়নের জন্য সম্ভাবনাময়। ছাতক ও তাহিরপুরের উঁচু এলাকায় শিল্প বিকশিত হয় গত শতকের মধ্য ভাগেই। সদর, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, ছাতক ও দোয়ারাবাজারে ভারতীয় কাঁচামাল নির্ভর শিল্প বিকাশের সম্ভাবনা প্রচুর। আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ স্থাপন হলে অন্য উপজেলাগুলোতে রপ্তানি নির্ভর শিল্প হতে পারে।
আসা যাক বাণিজ্যিক সম্ভাবনায়। শুধুমাত্র বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যে সিঙ্গাপুর পৃথিবীর ধনী দেশ। সুনামগঞ্জের এই সম্ভাবনা অতিসম্ভাবনাময়। ট্রানজিট নিয়ে বহু কথা থাকলেও ভারতীয় যান সেই ৭২ সাল থেকে ট্রানজিট ভোগ করছে। এর ২টি পথ আবার সুনামগঞ্জের উপর দিয়ে। নৌ ট্রানজিটের কথা বলছি। কলকাতা-করিমগঞ্জ ও ধুবরী-করিমগঞ্জ নৌ রুটের নৌযানগুলো বর্ষায় কুশিয়ারা নদী দিয়ে দিরাই ও জগন্নাথপুরের উপর দিয়েই আসা-যাওয়া করে। বাকি সময় নদীর উজানে নাব্যতা সংকট থাকে। ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত “ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট এন্ড ট্রেড” প্রটোকলে ৬ টি জলপথের উল্লেখ থাকলেও পরবর্তীতে এর আওতায় আশুগঞ্জকে যুক্ত করা হয়। আশুগঞ্জে নৌযানের পণ্য খালাস করে স্থলপথে আগরতলায় পৌঁছানো হয়। এর আওতায় সুনামগঞ্জ ও লাউড়েরগড়কে আনতে পারলে চলতি ও যাদুকাটা নদী ব্যবহার করে আসাম ও মেঘালয় উঠবে বালাট ও রানিকর তথা সুনামগঞ্জের পশ্চাদভূমি।
প্রায় ৩ বছর আগে বিভাগীয় কাস্টমস কমিশনারের সাথে দেখা করলে তিনি একটি সড়কের মানচিত্র দেখান। এতে দেখানো হয়, ঢাকা থেকে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সড়ক সোজা উত্তরে মহেশখলা পর্যন্ত আসবে, এরপর পশ্চিম দিকে একটি সড়ক যাবে কুড়িগ্রামের রৌমারী পর্যন্ত, পূর্ব দিকে আরেকটি সড়ক যাবে সিলেটের তামাবিল পর্যন্ত। তৎকালীন কমিশনার যুক্তি দিয়ে বোঝালেন এই মহাসড়ক হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম লাইফ লাইন। এর কেন্দ্রে থাকবে সুনামগঞ্জ তথা হাওরাঞ্চল।
হাওর জনপদে উৎপাদন ব্যবস্থায় বিপ্লব হয়ে যাবে যদি সকল নদী খনন করে হাওরের জমির বড় অংশকে দু’ফসলি জমিতে পরিণত করা যায়। একই সাথে মধ্যবর্তী বিলগুলোর গভীরতা বাড়ালে মাছের উৎপাদন বাড়বে। হাওরের কান্দায় পরিকল্পিত বনায়নও করা যায়। প্রতিটি হাওরে জরিপ করে “হাওর ব্যবস্থাপনা” করা হলে প্রতিটি হাওর হয়ে উঠবে ধানসহ অন্য ফসল, মাছ ও জলজ বনজ বনের সমৃদ্ধ অঞ্চল। হাওরের মধ্যবর্তী বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোকে একত্রে করে পুনর্বাসনের আওতায় গড়া যেতে পরিকল্পিত সমৃদ্ধ গ্রাম বা টাউনশিপ। যেখানে গ্রামীণ পরিবেশে থাকবে শহরের যাবতীয় সুবিধা।
জেলার টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি নিশ্চিত করতে কানেক্টিভিটি, শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশ এবং পরিকল্পিত কৃষি ও বনায়ন অতীব জরুরি। এর জন্য চাই জনপ্রতিনিধি তথা নীতিনির্ধারকদের বাস্তবভিত্তিক উন্নয়ন চিন্তা। প্রণয়ন করা যেতে পারে সুনামগঞ্জ জেলার উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা।
[লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সুনামগঞ্জ জেলা জাসদ]

শান্তিবার্তা ডটকম/১৩ মার্চ ২০২১ খ্রী.