শিরোনাম


Spread the love

নারী দিবসের সংগ্রামী ইতিহাস”
শেখ একেএম জাকারিয়া

প্রতিবছর ৮ মার্চ সারাবিশ্বে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আদি নাম নারী সম অধিকার দিবস বা আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস। পৃথিবীব্যাপী নারীরা বিশেষ উপলক্ষ্য হিসেবে এ দিবসটি উদযাপন করে থাকেন। পৃথিবীর একেক দেশে নারীদিবস উদযাপনের রীতি ও লক্ষ্য একেক রকম হয়। কোথাও নারীর প্রতি গতানুগতিক ‘মর্যাদা ও ভালোবাসা’ উদযাপনের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে, আবার কোথাও নারীর অর্থসম্বন্ধীয়, রাজনীতিসংক্ৰান্ত ও সমাজসম্বন্ধীয় প্রতিষ্ঠাটি বেশি গুরুত্ব পায়।
বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তারমধ্যে আফগানিস্তান,আর্মেনিয়া, আজারবাইজান,বেলারুশ, বুরকিনা ফাসো,কম্বোডিয়া, কিউবা, জর্জিয়া, গিনি-
বিসাউ, ইরিত্রিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজিস্তান, লাওস, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া,মন্টেনিগ্রো, রাশিয়া, তাজিকিস্তান,তুর্কমেনিস্তান, উগান্ডা, ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম ও জাম্বিয়া উল্লেখ্য। এছাড়া চীন, মেসিডোনিয়া, মাদাগাস্কার ও নেপালে শুধুমাত্র নারীরাই সরকারি ছুটির দিন ভোগ করেন। আমাদের দেশে এখনও নারী দিবসে সরকারি ছুটি ঘোষণা হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে
হয় তো নারী দিবসে ছুটির দিন ঘোষণা হবে সে আশা ব্যক্ত করি। এ সময়ে সবাই বিদিত নারী-পুরুষের জোটবদ্ধ প্রয়াসে নির্মিত হয়েছে আজকের মানবসভ্যতা। সাম্প্রতিক পৃথিবীতে নারী-পুরুষ একসঙ্গে সমধিকার নিয়ে সকল স্তরে কাজ করছে। তবে নারীর প্রাপ্য দাবি নিয়ে কর্মক্ষেত্রে সার্থকভাবে কাজ করার পেছনে রয়েছে এক দুঃসাহসী লড়াইয়ের অতীতকথা। ১৮৫৭ সালে মজু্রিবৈষম্য, কর্মঘন্টা সুনিশ্চিত করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নামেন কোরা সুতো কারখানার নারী শ্রমজীবীরা। যারা সে সময়ে সুতো কারখানায় কায়িক শ্রমদ্বারা জীবিকানির্বাহ করতেন। তাদের সেই প্রতিবাদ মিছিলে চলে সরকারের লেঠেল বাহিনীর শাসন-উৎপীড়ন। সেদিন মিছিল চলাকালীন আটক হন অনেক নারী শ্রমিক। অতঃপর চার যুগেরও অধিক সময় শেষে আসে ১৯০৮ সাল। নিউইয়র্কে বস্ত্রশিল্পের নারী শ্রমজীবীরা কাজের শান্ত পরিবেশ, সময় এবং ন্যায্য মজুরির দাবিতে গণবিক্ষোভ করেন। পরের বছর অর্থাৎ ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নারীর সম্মানবৃদ্ধিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক দল জাতীয়ভাবে সর্বপ্রথম নারী দিবস পালন করে। নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম এই আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, ক্লারা জেটকিন সে সময়ে জার্মান রাজনীতিবিদ ও জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন ছিলেন। এরপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে মোট ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। এ সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সম্মেলনে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে ১৯১১ সাল থেকে ০৮ মার্চকে সম-অধিকার দিবস বা আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা করা হয়। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বা শাসনব্যবস্থায় বিশ্বাসী কিংবা অনুসারীগণ। এ ইশতাহার বা ঘোষণা আন্দোলিত করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশকে। ১৯১১ সালের ১৯ মার্চে প্রথমবারের মতো অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মান ও সুইজারল্যান্ডের এক মিলিয়নেরও অধিক নারী অংশ নেয় নারী দিবসের রেলিতে। একই সঙ্গে নারীদের সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে পুরুষরাও। তারা নারীদের ভোটদান ও সরকারি অফিসে কাজ করার দাবি জানান। পরে আস্তে আস্তে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে নারী অধিকার বিষয়ক সচেতনতা। ১৯১৩ সাল থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে ইউরোপের সমৃদ্ধিশালী দেশ রাশিয়া ফেব্রুয়ারির শেষ রবিবার আন্তির্জাতিক নারী দিবস পালন করে। তাছাড়া ১৯১৪ সালের ০৮ মার্চ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়ার দাবিতে ইউরোপে নারীরা রেলি বের করেন এবং সে বছর পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশেই ঘটা করে ৮ মার্চ দিনটি পালন করা হয়। এদিকে ১৯৭১ সালে ০৮মার্চ বাংলাদেশে প্রথম নারী দিবস পালিত হয়। অতঃপর ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি উদযাপনের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। সেই থেকে নারীর সম-অধিকার আদায়ের অনুভূতি পুনরায় ব্যক্ত করে ০৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পৃথিবীব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।

লেখক:
কবি ও প্রাবন্ধিক
সভাপতি, সুনামগঞ্জ সাহিত্য সংসদ (সুসাস)

শান্তিবার্তা ডটকম/৮ মার্চ ২০২১ খ্রি./