শিরোনাম
  জনগণের দোরগোড়ায় সেবা নিয়ে ডিজিটাল সেন্টার       সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটি অনুমোদন       পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের ১০ম বর্ষপূর্তি উদযাপন       উন্নয়নে বিভেদ নয়, এখন ঐক্য ও সহযোগীতার সময়- পরিকল্পনামন্ত্রী       করোনা মুক্ত গ্রাম গড়তে হলে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে-আবু সাদাত মো. লাহীন       ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে মহিলা লীগের সভাপতিকে হয়রানির অভিযোগ       জগন্নাথপুরে রাধারমণ দত্তের ১০৫তম প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণসভা       সুনামগঞ্জ জামালগঞ্জে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট এর বীজ বিতরণ       রায়হান হত্যা- ৭ দিনের রিমান্ডে আকবর       তবুও তোমায় ভালোবাসি- মোছাঃ তামান্না আক্তার    


এক যুগ আগেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কেউ মোবাইলে কথা বললে গ্রামের মানুষ উত্সুক হয়ে তাকিয়ে থাকত। প্রবাসীরা স্বজনদের কাছে বার্তা পাঠাতে হলে শহরে গিয়ে সময় বেঁধে দিয়ে ল্যান্ডফোনের দোকানে অপেক্ষা করত, নয়তো চিঠি বা টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করে পাঠাত জরুরি কথা। সামান্য ফটোকপি, কম্পোজ বা অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও মানুষ বাধ্য হতো শহরমুখী হতে।

ভিশন-২০২১ তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে এবং জনগণের দোরগোড়ায় সহজে, দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে সরকারি-বেসরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের চার হাজার ৫০১টি ইউনিয়নে একযোগে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র উদ্বোধন করেন, যা বর্তমানে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) নামে পরিচিত। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের বাস্তবায়নাধীন ও ইউএনডিপির সহায়তায় পরিচালিত এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) প্রগ্রাম শুরু থেকেই এই ডিজিটাল সেন্টারগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে দেশব্যাপী ছয় হাজার ৬৮৬টি ডিজিটাল সেন্টারে ২৭০টির অধিক সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রদান করছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত ডিজিটাল সেন্টার থেকে মোট ৫৫.৪ কোটি সেবা প্রদান করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে নাগরিকদের ১৬৮ কোটির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা ও ৭৬ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে। ডিজিটাল সেন্টারের হাত ধরে দীর্ঘ ১০ বছরে বদলে গেছে তৃণমূল বাংলার চিত্র, শহরের সেবা পৌঁছে গেছে গ্রামে। সহজ ও আধুনিক হয়েছে নাগরিক জীবন। এই দীর্ঘ পথচলায় ডিজিটাল বাংলাদেশের সাফল্য ও স্বনির্ভরতার গল্পে জুড়ে রয়েছে একঝাঁক তরুণের একনিষ্ঠ পরিশ্রম।

অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরকারি অফিসগুলোর মাধ্যমে বিস্তীর্ণ পরিসরে সরকারি সেবা প্রদান করা হয়, যা সেবাগ্রহীতা ও প্রদানকারী উভয়ের জন্য অধিক শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। গ্রামে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর জন্য শহরে বা উপজেলা শহরে অবস্থিত সরকারি অফিস থেকে সেবা গ্রহণে দীর্ঘ পথ যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার জন্য অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। জনগণের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভোগান্তি কমানোর লক্ষ্যে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ইউনিয়নভিত্তিক কাজ করে যাচ্ছে ডিজিটাল সেন্টার। এসব ডিজিটাল সেন্টার এমনভাবে ছড়িয়ে রয়েছে যেন একজন নাগরিক তিন থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে যাতায়াত করেই সেবা গ্রহণ করতে পারে। অথচ আগে সেবা গ্রহণের জন্য তাদের উপজেলা পর্যায়ে ২০ কিলোমিটার কিংবা জেলা পর্যায়ে ৩৫ কিলোমিটারের অধিক পথ পাড়ি দিতে হতো। ডিজিটাল সেন্টারগুলো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যেমন গ্রামীণ নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বৃদ্ধ যারা নিরক্ষর ও আইসিটি বিষয়ে দক্ষতা কম তাদের প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করছে।

ডিজিটাল সেন্টারের কল্যাণে রাষ্ট্রের তৃণমূল পর্যায়ের নাগরিকরা দুইভাবে উপকৃত হচ্ছে। প্রথমত, প্রতিটি ইউনিয়নে তৈরি হচ্ছে নতুন উদ্যোক্তা। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর সেবার ফলে গ্রামের মানুষ দ্রুত ও কম খরচে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা লাভ করছে। প্রথমে শুধু ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্রিকের কার্যক্রম চালু হলেও বর্তমানে পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, গার্মেন্টকর্মী ও প্রবাসী নাগরিকদের জন্য আলাদা ডিজিটাল সেন্টার চালু হয়েছে।

ডিজিটাল সেন্টারগুলো মূলত এক ধরনের স্পেশালাইজড মাইক্রো-এন্টারপ্রাইজ, যা স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি কর্তৃক নির্বাচিত একজন পুরুষ ও একজন নারী উদ্যোক্তা কর্তৃক পরিচালিত হয়। বর্তমানে দেশব্যাপী ছয় হাজার ৬৮৬টি ডিজিটাল সেন্টারে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন ১৩ হাজার ৩৭২ জন, এঁদের অর্ধেক নারী উদ্যোক্তা।

জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা ডিজিটাল সেন্টারগুলোর সব কার্যক্রম নিয়মিত সরাসরি তত্ত্বাবধান করে আসছেন। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সচিবরাও উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন এবং সব সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন।

ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তারা বেতনভোগী কোনো কর্মচারী নন, তাঁরা জনসাধারণকে সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রদানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন। সেন্টারের দৈনন্দিন খরচ—যেমন ইউটিলিটি চার্জ, ইন্টারনেট বিল, কম্পিউটার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ইত্যাদি উদ্যোক্তাদের বহন করতে হয়। ডিজিটাল সেন্টারের উপকরণ রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্ব উদ্যোক্তার। প্রয়োজন অনুযায়ী উপকরণ বাড়াতে উদ্যোক্তা নিজে বিনিয়োগ করতে পারবেন। ডিজিটাল সেন্টারকে সচল রাখা, আয় বৃদ্ধি ও টেকসইকরণের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান ও সচিবের সঙ্গে সমন্বয় করে এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পরামর্শে উদ্যোক্তা সব প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন।

সাধারণত একটি ডিজিটাল সেন্টারে ডেস্কটপ/ল্যাপটপ কম্পিউটার, ইন্টারনেট মডেম, প্রিন্টার, ডিজিটাল ক্যামেরা, ফটোকপি মেশিন, স্ক্যানার, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, লেমিনেটিং মেশিন ইত্যাদি থাকে। যেখান থেকে একজন উদ্যোক্তা সেবা প্রদানের মাধ্যমে মাসে প্রায় পাঁচ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। গড়ে প্রতি মাসে ডিজিটাল সেন্টার থেকে ৬০ লাখেরও বেশি মানুষ সেবা গ্রহণ করে থাকে। 

এভাবে ডিজিটাল সেন্টারগুলো ধাপে ধাপে প্রকৃত বিজনেস সেন্টারে পরিণত হচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিং, একশপ কার্যক্রম এবং নতুন নতুন সরকারি-বেসরকারি সেবা সংযোজনসহ বিভিন্ন সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে ডিজিটাল সেন্টার জনগণের দোরগোড়ায় সেবা প্রদান নিশ্চিত করছে, পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় প্রায় ৭০ শতাংশ উদ্যোক্তা ছিলেন যাঁদের মাসিক গড় আয় পাঁচ হাজার টাকার নিচে ছিল। বর্তমানে তাঁদের (৭০ শতাংশ উদ্যোক্তা) প্রতি মাসে গড়ে ১০ হাজার টাকার অধিক আয় হয়।

বর্তমানে এসব ডিজিটাল সেন্টার থেকে ২৭০-এর অধিক সেবা প্রদান করে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জমির পর্চা, নামজারি, ই-নামজারি, পাসপোর্টের আবেদন ও ফি জমাদান, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, হজ রেজিস্ট্রেশন, সরকারি সেবার ফরম, টেলিমেডিসিন, জীবন বীমা, বিদেশে চাকরির আবেদন, এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, বাস-বিমান-লঞ্চ টিকেটিং, মেডিক্যাল ভিসা, ডাক্তারের সিরিয়াল নেওয়া, মোবাইল রিচার্জ, সিম বিক্রি, বিভিন্ন ধরনের কম্পিউটার ও কারিগরি প্রশিক্ষণ, ই-মেইল, কম্পোজ-প্রিন্ট-প্রশিক্ষণ, ফটো তোলা, ফটোকপি, সরকারি ফরম ডাউনলোড করা, পরীক্ষার ফলাফল জানা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করা, অনলাইনে ভিসার আবেদন করা, কৃষি পরামর্শ ও তথ্য সেবা ইত্যাদি।

নাগরিকদের জীবনমান পরিবর্তনে ইতিবাচক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ডিজিটাল সেন্টার ২০১৪ সালে ই-গভর্নমেন্ট ক্যাটাগরিতে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছে।

সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং সেবা প্রাপ্তিকে আরো সহজ করার লক্ষ্যে ডিজিটাল সেন্টার আরো বৃহত্তর পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে দেশের যেকোনো প্রান্তের নাগরিকদের দুই কিলোমিটার আওতার মধ্যে সেবা প্রদান নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০২৩ সালের মধ্যে ১০ হাজার ডিজিটাল সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং আরো সেবার সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। সেবা তালিকায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নতুন নতুন সেবা সংযুক্তকরণের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় প্রায় ৫০০ সরকারি-বেসরকারি সেবা এসব সেন্টারের মাধ্যমে প্রদান করা হবে।

ডিজিটাল সেন্টার পাল্টে দিয়েছে বহু উদ্যোক্তার জীবন। দেশের বিভিন্ন ইউনিয়নে এমন বহু উদ্যোক্তা আছেন, যাঁরা ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে নিজের জীবনে পরিবর্তন এনেছেন, সফল হয়েছেন এবং অর্জন করেছেন সামাজিক স্বীকৃতি। শুধু তা-ই নয়, ডিজিটাল সেন্টারে প্রশিক্ষণ শেষে বহু তরুণ বেকার নিজেরাই গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠান, হয়েছেন উদ্যোক্তা। দারিদ্র্য বিমোচনে এমন যুগান্তকারী সফল পদক্ষেপ শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী নন্দিত হচ্ছে। একই সঙ্গে যে গ্রামের মানুষ শুধু রাত-দিন পরিশ্রম করে বঞ্চিত থাকত আধুনিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে, আজ রাষ্ট্রের যেকোনো সেবাই তাদের ঘরের কাছে। ডিজিটাল সেন্টার এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে এক পরম বিশ্বস্ততার নাম।

লেখক : মো. তহুরুল হাসান, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ডিজিটাল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস, এটুআই

শান্তিবার্তা ডটকম/১২ নভেম্বর ২০২০/ কালের কন্ঠ