শিরোনাম


দু’শো টাকা কেজি কাঁচা লংকা। আকাল। তিন দফা বন্যায় দামও দফায় দফায় বেড়ে তিনশো।
আজকাল লোকাল খুব একটা মেলেনা। চালানের মাল, দূরদূরান্ত থেকে আসে। কখনও কখনও ইম্পোর্টও নাকি হয়। তা হোক, ব্যাপারটা দামের নয়,স্থানেরও নয় । মূল্যবৃদ্ধির সাথে লংকার ঝালের তুলনা করে মাঝে মাঝে টিভি আর খবরের কাগজে শিরোনাম হলেও আসলে দামে ঝালে সম্পর্ক নেই মোটেও। বেশী দামের লংকায় বেশী ঝাল,কম দামে কম ঝাল তেমনটি নয়। বিষয়টি আরেকটু গভীরে, যখন লংকা হয়ে যায় গবেষণার এক উপাদান, আর কাঁচালংকার জন্য যদি লংকাকান্ড ঘটার উপক্রম হয়।

ভাজা বড়ার সাথে কাঁচা লংকার সেই আদ্যিকালের সম্পর্ক। আর আমারও ছোটবেলা থেকে ভাজা বড়ার আকর্ষণ বুড়ো বেলার অভ্যেস। মধ্যাহ্ন বা নৈশ ভোজে ভাজা বিহনে রসনাটা ঠিক তৃপ্ত হয় না। বড়মাছ কিংবা ছোটমাছ, পুটিমাছ হলেতো কথা নেই। মাছভাজা সঙ্গে কাঁচা লংকা, কেমন একটা সখী সখী সোহাগী ভাব। ঘষে,টিপে মেখে খাও, ভাজা আর ভাত মিলিয়ে দাতে কামড়ে ক্যাচ ক্যাচ করে খাও, সে এক মধুর ঝাল ঠসঠসে স্বাদে অর্ধ ভোজন কমপ্লিট । তারপর অন্য কথা, অন্য ব্যাঞ্জন।
কিন্তু আজকের দুপুর বেলা মাছ ভাজা আর কাঁচালংকায় সোহাগী স্বাদটা মিলছে না। যুগল মিলনে হঠাৎ বিরহ। মাখামাখা ঝাল কোথায় যেনো হারিয়ে গেলো। ঘসে নিলাম আরেকটা। না, তাতেও হলো না। ঘ্যাচ করে কামড়ে ভাতের সংগে চিবুই, না, ঝাল কই। মরিচের স্বাদ ঝালে। গন্ধ তো পরে। কিন্ত গভীর অনুসন্ধানেও তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সকালবেলাতেই আনলাম। নুতন চালানের মাল। গ্লামারও অটুট। তাহলে? ভড়কে গেলাম বেশ। মাথার ভেতর একটা সন্দেহ পোকা ভন ভন করছে।
পরশু বাইরে গেছিলাম। ফেরার পথে রাতের বেলা বৃষ্টিভেজা ঠান্ডা হাওয়া লেগে কাশি কাশি ভাব ছিলো। এখন কাশিটা যেনো বুক ঠেলে বার বার গলায় এসে খোচা মারছে। চার পাচ দিন আগে ঋতু পরিবর্তনের ম্যাজ ম্যাজে শরীরে একটু জ্বরও ছিলো। পাত্তা দেইনি। সেরেও গেছিলো। এখন দেখছি গা গরম।
গিন্নি বলেন, কি হলো। খাচ্ছো না যে।
বললাম, কি খাবো,স্বাদ পাচ্ছি না।
বলো কি,হঠাৎ এমন?
আমি কাঁশি চেপে বলি, আচ্ছা তুমি খেয়ে দেখেতো। মুখে ঝাল লাগে কি না।
গিন্নি মরিচ ভেঙ্গে সাবধানে অল্প ভাতে মাখলেন। একটা গবেষণা সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। সতর্কতার সঙ্গে মুখে পুরা হলো । প্রতিক্ষায় উৎকন্ঠার সময় পার হচ্ছে। এক গ্রাস শেষ করে কিছু না বলে ফলাফল ঝুলিয়ে রেখে তাজা দেখে আরেকটা নিলেন। ভাত মুখে মরিচের আধখান কামড়ে দিলেন। আমি পরিবেশ পরিস্থিতির উপর গভীর নজর রাখছি। তারপর বাকি অর্ধাংশ। ঝালের কোনো লক্ষণ ঠোটে, মুখে, চোঁখে প্রকাশিত হলো না। মুখমন্ডলের রং আকৃতি স্বাভাবিক। তবে গাম্ভীর্যের ভাব। ততোধিক গম্ভীর স্বরে উচ্চারিত হলো,না ঝাল লাগছে না।
হুম, তবে তুমিও।
প্রথমে একটু থতমত খেলেও বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে বুঝতে অসুবিধা হলো না।
এ্যাঁ! আমিও বলে সেতো এক হুলোস্থুল ব্যপার। হৈ হৈ কান্ড।
কেনো যে প্রথমেই উনার উপর ট্রায়াল দিতে গেলাম। যতই বলি অস্থির হয়োনা, বুঝে নেই আগে, দেখে নেই আরেকটু, গিন্নীর অস্থিরতা ততই বাড়ে। ব্যাপক টেনশনে হাটার স্পিডও বাড়ছে। উত্তেজিত হলে উনার বসে থাকাটা কঠিণ হয়ে পড়ে। বারন্দার এপ্রান্ত ওপ্রান্ত, এঘর সে ঘরে বিরামহীন হাটা চলতেই থাকে । আমারও যে কিছু হচ্ছে না, তা নয়। মাথার ভেতর পোকার ভন ভন এখন এ্যম্বুলেন্সের সাইরেনের মত কুই কুই করছে।
গিন্নী মোবাইলটা হাতে নিতে চাইলে নিবৃত্ত করলাম। এখনই সংবাদ প্রকাশের প্রয়োজন নেই। ছ’মাস ধরে বিনেমূল্যে কতো উপদেশ, সতর্কবার্তা, কতো জ্ঞান লাভে সমৃদ্ধ হয়েছি। এখন সেটা কাজে লাগানোর সুযোগ। ধৈর্য হারালে কি চলে। আরো পর্যবেক্ষনের প্রয়োজন। ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলা করতে হবে সবকিছু।

গিন্নীর কর্ম সহযোগিনী আছেন দু’তিন জন। এখন পারমান্যান্ট কেউ নেই। অনলাইন সার্ভিস। প্রয়োজনে মোবাইলে কল করা হয়। কর্মের ধরণ অনুযায়ী ডাক পড়ে। মোবাইল ফোনে নাম্বার মজুত আছে অনেকগুলি। একেক জনের দু’তিনটে করে সিম। প্রমিলা-১, প্রমিলা -২,৩। জরিনা-১ থেকে ৪ পর্যন্ত। আজ প্রমিলা রানী সকাল থেকে উপস্থিত বিনা কলেই। তা নিজেরও গরজ থাকে। ব্লিচিং মেশানো পানিতে পা ধুয়ে গুড়া সাবানে হাত পরিষ্কার করে, মুখে মাস্ক লাগিয়ে ঘর মুছে, কিছু কাপড়চোপড় ধুয়ে দেয়। মজুরীতে তেমন দর কষাকষির প্রয়োজন হয় না। আর যে তাগিদে আসা, লাকড়ি, শুকনো ডাল, পরিত্যক্ত বাঁশ,সুপারি গাছ থেকে পড়া ছই জমা করে আঁটি বেঁধে রাখে। সুযোগে পুরনো কাঠের স্তূপ থেকে দু’এক টুকরো টেনে টুনে বের করে নেয়। দু’তিন দিনের রান্নার ব্যবস্থা হয়ে যায়।
মরিচটা মুখে দিয়ে দেখতো কেমন লাগে । হতভম্ব প্রমিলা। মরিচ আবার খালি খালি খায় ক্যামনে।
ভাত দিয়েই খেয়ে দেখ।
প্রমিলার গায়ের রং কালো, শুকনো গড়নের হাড্ডি হাড্ডি শরীর। আবার একটু খিটখিটে ঝগড়াটে স্বভাবও আছে। ভালো কথা বললেও মনে হয় ঝগড়া করছে।
মানব জিভে কাঁচা লংকার কার্যকারীতা পরীক্ষা । এমুহূর্তে কালো খিটখিটে প্রমিলাকে কোভিড ভ্যাকসিন গ্রহন কারী প্রথম স্বেচ্ছাসেবী এলিসা গ্রানাটোর মতো শান্ত,সৌম্য সুশ্রী লাগছে।
দু’তিনটি মরিচ নিঃশেষ করে মুখ ভেংচে খাউ খাউ করে উঠে – ওমা, দাদা কি মরিচ লইয়া আইছে আইজকা। বনেলা মরিচ,ফাইন্সা এক্কেরে। তিনশু টাহা কেজি আর এক পইসার ঝাল নাই। কি সময়ডা এক্কন।
তা হলে বোধ হয় কাঁচা মরিচেরই দোষ। ঝাল নেই। আমাদের জিভের স্বাদ হয়তো ঠিকই আছে। কিন্ত এখনই নিশ্চিন্ত হওয়া যাবেনা। দ্বিতীয় ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে। তৃতীয় ট্রায়ালে উত্তীর্ন হলেই পাঁকা সিদ্ধান্ত। আরেকজন স্বেচ্ছাসেবীর দরকার। যার উপর কাঁচামরিচ প্রয়োগ করা যায়। গিন্নীর টেনশন এখনও কাটেনি। দ্রুত আঙ্গুলে মোবাইল টিপে জরিনা-১,জরিনা-২। তিনে গিয়ে সাড়া মিললো।
জরিনা তুমি কই?
ভগবান সহায়, কাছাকাছি কোথাও যেনো আছে।
কোন এক এনজিও’র রিলিফ দেয়ার কথা ছিলো। তার খোঁজে বেরিয়েছে। তবে আজ আর দেবে না তাই বাড়ি ফিরে যাবে। যাতায়াত আমাদের সামনা দিয়েই।
আচ্ছা, তাড়াতাড়ি আসো।
অল্পক্ষণেই জরিনা বেগমের উপস্থিতি। মাস্ক খুলে হাসিমুখে জিজ্ঞাসা, কি কারণে জরুরী তলব আইজকা। প্রমিলাকে দেখে মুখটা একটু মলিন হয়। কপাল কুঁচকে ওর দিকে তাকায়। এখানেও একটা শ্রেণী স্বার্থ কাজ করে। অঘোষিত দ্বন্দ। দু’জনেরই জ্বালানী সংকট। প্রমিলা যখন আগে এসে গেছে, লাকড়ির দখল এতক্ষণে নিয়ে নিয়েছে।
কোনো কাজ নেই আজ। বসো।
গিন্নী একটা প্লেটে কয়টা কাঁচা মরিচ জরিনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন – খাও।
ওমা, এইটা আবার কেমন মেহমানদারী, হুদা মরিচ দিয়া।
খেয়ে দেখো আগে।
এমনিতে জরিনা গিন্নীর খুব ভক্ত। কোনো কাজেই না নেই। বিরক্তিও নেই। এবার আর কোনো প্রশ্ন না করে সামনের দাত দিয়ে সাবধানে একটু পরখ করে। চারপাশে তাকিয়ে সবাইকে দেখে নেয়, কোনো ভাবে বোকা বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কিনা। না তেমন নয়। সবাই সিরিয়াস। এবার ভালো করেই কামড় বসায়। একটা,দুইটা, তিনটা। খানিক চিবিয়ে থু করে ফেলে দেয়। থওবা, থওবা, হারামও ঝাল নাই। এইটা আবার কি মরিচ। বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ায় – মনে লয় দুই লম্বরি । নকল।

সব কিছুই তো নকল হয়। নকল মাস্ক, নকল ওষুধ, নকল ঘি, নকল পারফিউম, নকল রিপোর্ট এমনকি নকল ডিম, নকল দুধ। মহার্ঘ মরিচ নকল হলে আশ্চর্য কি।
প্রমিলা খিক খিক করে হেসে আরেক কাঁটি এগিয়ে বলে- পেলাস্টিকের

শান্তিবার্তা ডটকম/৪ সেপ্টেম্বর ২০২০