শিরোনাম


নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

বর্তমান সময়ে এমন কোন সভা-সেমিনার-সম্মেলন-টকশো-পত্রিকার কলাম নেই যে, মাদক ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে বলা হয় না। এতো সব বিরুদ্ধাচারণ কিন্তু কোন ভাবেই যেন রোধ করা যাচ্ছে না এ সকল অপকর্ম। সরকারে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণ পর্যায় হতে সর্বস্তরের সচেতন মানুষ এর বিপক্ষে আওয়াজ তুলছেন। আমাদের আইন-শৃংখলা বাহিনী সদা তৎপর।

সরকারের কোটি কোটি অর্থ ব্যয় হচ্ছে মাদক নির্মূলে; বর্তমানে কিছু পরিমাণ কমলেও নিমূল করা যাচ্ছে না সমূলে। সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার। মাদক ও অপসংস্কৃতি চর্চার প্রধান স্টেইকহোল্ডার হচ্ছে বিপদগ্রস্ত ও হতাশাগ্রস্ত যুব সমাজ।

সমাজের এই সম্ভাবনাময় চালিকাশক্তি যুব সমাজকে জ্ঞানের আলোয় সমৃদ্ধ করতে গ্রাম ভিত্তিক গণ পাঠাগার করার বিকল্প নেই। যে সময় টা যুব সমাজ অবসর থাকে সে সময়টা পাঠাগারে এসে বই-পত্রিকা পড়ে জ্ঞান চর্চা করতে পারে এবং গ্রন্থাগার কেন্দ্রিক বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত হতে পারে। যুবদের মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধ ও আত্ম-মর্যাদা বৃদ্ধি করতে একমাত্র পাঠাগারই রাখতে পারে বৈপ্লবিক ভূমিকা।

ইতিমধ্যে পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশ সংগঠনটি সমগ্র দেশব্যাপি আলোকিত সমাজ ও গ্রাম তৈরী করতে দেশের প্রতিটি গ্রামে একটি করে পাঠাগার করতে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজন সমাজের সর্বস্তরের মানুষের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা। বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে পাল্টে যেতে পারে দেশের গ্রামের প্রেক্ষাপট ও সমাজের চিত্র। তাই বলা যায়, মাদকসহ সকল অপসংস্কৃতি নির্মূলে পাঠাগার হচ্ছে একমাত্র নিয়ামক।

পাঠকের মধ্যে বই পাঠের আনন্দ সৃষ্টি করতে সরকার ও বিশ^ সাহিত্য কেন্দ্রের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি উদ্যোগ যথেষ্ট প্রয়োজন। বাঙ্গালির বই পড়ার মাঝে ভয়াবহ রকমের অনীহা। বই হাতে নিলে তাদের দেদারসে ঘুম আসে আর কেউ কেউ অফিস বা বাসায় নিজের বরাদ্দকৃত চেয়ারের পিছনে গøাসের আলমারিতে বড় বড় ভলিউমের বই সাজিয়ে রাখেন, যা রুমের ও ব্যক্তির শোভা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এইসব ভদ্রজনদের কে বা কারা বুঝাবে যে এই ভাবে রুম বা ব্যক্তির শোভা বৃদ্ধির অপচেষ্টা কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না , প্রকৃতভাবে রুম ও ব্যক্তির শোভা বৃদ্ধি করতে হলে বইয়ের অমৃত রস আস্বাদন করতে হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি উদ্যোগে এই বই পড়ার আন্দোলন কে বেগবান করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিসে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে। যেখানে অফিসের সর্বস্তরের স্টাফগণ বই পড়ার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে।

লাইব্রেরির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতপূর্বক লাইব্রেরি কেন্দ্রিক বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। আমাদের ছাত্র সমাজ কে লাইব্রেরি মূখী করতে পারলে আগামীর অপার সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

পাঠাগার করার আরেকটির সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হচ্ছে সেলুন লাইব্রেরি। সম্প্রতি ভারতের তামিলনাড়–র এক নাপিত তার সেলুনে লাইব্রেরি স্থাপন করে রীতিমত হইচই পেলে দিয়েছেন। মানুষ কে বই পড়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে তিনি সেলুনে লিখে দিলেন তার “সেলুন লাইব্রেরি” হতে যারা বই পড়বে তাদের জন্য ৩০% চুলকাটার পারিশ্রমিক দিতে হবে না নির্ধারিত ফি হতে। যা রীতিমত আমাদের মত শিক্ষিত ও মার্জিত সমাজের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তামিলনাড়–র এই নাপিতের মতোই আমাদের দেশে লালমনিরহাট জেলার তরুণ উদ্যোক্তা জামাল উদ্দিন গড়ে তুলেছেন বেশ কিছু সেলুন লাইব্রেরি।

অনেকেরই বলতে শুনি, আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে ফেইসবুক দুনিয়ায় মানুষ কি আর এমন বই পড়ে। আমি তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বিনয়ের সাথে বলতে চাই, পূর্বের সভ্যতা থেকে পরবর্তী সভ্যতার উত্তরণের পরিমাপক প্যারামিটার হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজিকরণ। অর্থ্যাৎ সভ্যতার আশির্বাদে দিন দিন আন্তঃ ও বহিঃ যোগাযোগ যত সহজতর হবে মানুষের জীবনযাত্রার মান তত উন্নত হবে।

বর্তমানে ঠিক তেমনি একটি যোগাযোগ বিপ্লবের নাম হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। যার অন্তর্জালে গোটা পৃথিবীর মানুষ বন্দী। মানুষ এখন প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু লিখছে এবং কিছু না কিছু পড়ছে। বিশেষ করে ফেসবুক, টুইটার, গুগল+, ইনস্ট্রগ্রাম,লিংকইন, ইমু ও হোয়াটআপ এর মাধ্যমে। সেটা হউক মাঠে-ময়দানে, খালে-বিলে, আকাশ-পাতালে সবত্রই সবস্থানে। যা পূর্বের সভ্যতায় কল্পনাও করা যেত না। সুতরাং এ কথায় সবাই নির্ধিদায় একমত হবেন যে, স্যোশাল মিডিয়া প্রতিনিয়ত সচেতন পাঠকগণ কিছু না কিছু পড়ছে এবং লিখছে।

তবে যে বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞগণ উদ্বেগ সেটি হচ্ছে মানুষ দিন দিন সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি মাত্রারিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ছে। যা এক ধরনের অস্বস্তি ও অসুস্থতার লক্ষণ। যেটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষতের জন্য ভয়াবহ রকমের হুমকি। গেল কিছুদিন পূর্বে ০৫ ফেব্রæয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস-২০২০ এর মূখ্য আলোচক এর বক্তব্যে দেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল মহোদয় শাহবাগ গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর এর মিলনায়তনে উদ্বেগের কণ্ঠে বলেন “ফেইসবুক মাদকের চেয়ে ভয়াবহতম নেশা”। যেটা আমাদের ছাত্র ও যুব সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয় আমাদের চিন্তা শক্তি হ্রাস ও সামাজিক মেলবন্ধন বিনষ্ট করছে। নীতি নির্ধারকগণ যদি এখনি বিষয়টি নিয়ে না ভাবেন, তাহলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম কে নিয়ে হুমকির মুখে পড়তে হবে।

সুতবাং সমাজের সচেতন মানুষের পাশাপাশি সরকারকেও নিতে হবে বিশেষ উদ্যোগ গ্রামে গ্রামে পাঠাগার গড়তে। যুব সমাজকে বই মূখী করতে এর চেয়ে ভালো কোন পন্থা আর হতে পারে না। তাই বলি, মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার- গ্রামে গ্রামে পাঠাগার।

লেখক: মো: ইমাম হোসাইন

ট্রাস্টি বোর্ড চেয়ারম্যান, পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশ।

সভাপতি, বাংলাদেশ বেসরকারি গণগ্রন্থাগার পরিষদ।

প্রেসিডেন্ট, জাতীয় যুব সংসদ বাংলাদেশ।

শান্তিবার্তা ডট কম/১৪ জুলাই ২০২০