বাংলাদেশের হাওর প্রধান জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জ অন্যতম। প্রতিবছর কৃষকরা বন্যার ভয়কে মাথায় নিয়ে বোরো ধানের আবাদ করে থাকেন। ২০১৭ সালের বন্যায় সকল বাঁধ ভেঙে জেলার ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর থেকে কৃষকের ধান আবাদে থাকে এক ধরনের ভয়। এবারও প্রশাসন থেকে আগাম বন্যার সতর্কতা দেওয়া হলে এবং করোনাভাইরাসের কারণে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে ধান কাটার নির্দেশনা থাকলেও বন্যার আগেই হাওরের ধান কেটে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন কৃষকরা।

বিগত বছরগুলোর তুলনায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় ধান উৎপাদন হয়েছে অনেক। কিন্তু হাওরে ধানের বিপ্লব হলেও ধান ঘরে তুলে খুশি নন জেলার অধিকাংশ কৃষক।

সরকার থেকে দালাল, ফড়িয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবের চিত্রটা ভিন্ন। কৃষকের ধান খাদ্য গুদামে দেওয়ার আশ্বাসে কৃষি কার্ড নিয়ে যাওয়া হলেও ধানের ন্যায্য টাকা পাচ্ছেন না তারা এবং সরাসরি খাদ্যগুদামে ধান দিতে না পারায় বাধ্য হয়েই ধানগুলো বিক্রি করতে হচ্ছে বেপারীর কাছে।

জানা যায়, সুনামগঞ্জে ১১টি উপজেলার ছোট-বড় ১৫৪টি হাওরে দুই লাখ ২০ হাজার ৯৪৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। সেখানে ধানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লক্ষ মেট্রিক টন। কিন্তু এ বছর সুনামগঞ্জ থেকে সরকার ধান সংগ্রহ করবে ২৫ হাজার ৮৬৬ মেট্রিক টন ধান এবং একজন কৃষক সর্বোচ্চ তিন টন চাল দিতে পারবেন গুদামে। যা জেলার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা চেয়ে বেশি কম হওয়ায় কৃষকরা বাধ্য হচ্ছেন বেপারীর কাছে কম দামে বিক্রি করতে। সরকার থেকে বোরো ধান কেজি প্রতি ২৬ টাকা দরে কেনার ঘোষণা দিলেও এবং মনপ্রতি ১০৪০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও দালাল-ফড়িয়ার কাছে জিম্মি হয়ে তা বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা মণে।

সরকার নির্ধারিত ধান ক্রয়ে কৃষকের নামে লটারি করা হলেও অভিযোগ আছে সেখানে প্রকৃত কৃষকের সংখ্যা নিয়ে। কৃষকের ধান খাদ্যগুদামে বিক্রি করে দেওয়ার আশ্বাস দেখিয়ে দালাল ও ফড়িয়ারা তালিকাভুক্ত কৃষকের কাছে কার্ড দিয়েই খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করে এবং মনপ্রতি কম টাকা প্রদান করার অভিযোগও রয়েছে।

সরেজমিনে, সুনামগঞ্জ জেলার বৃহত্তম হাওর দেখার হাওর ঘুরে দেখা যায় হাওরে চলছে ধান মাড়াই ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ। রোদে শুকিয়ে ধানগুলোকে ঠিকঠাক করে নিচ্ছেন কৃষক ও কৃষাণীরা। রাস্তার পাশে বা খোলা মাঠে ধান শুকানো থেকে শুরু করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কাজে ব্যস্ত রয়েছেন তারা।

হাওরে কৃষকের কাছ থেকে জানা যায়, ধান ভালো হওয়ার খুশিটা যেমন একদিকে অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি না করে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা মণে ধান বিক্রি করে দেওয়া ছাড়া তাদের কিছু করার নেই। এতে করে কৃষকের ধান চাষ করে লাভবান হওয়ার চাইতে ক্ষতি মুখই দেখতে হচ্ছে তাদের। সরাসরি খাদ্যগুদামে ধান দিতে না পারায় এবং ধান নিয়ে গেলেও নানা কারণে ধান বাতিল হয়ে যাওয়ার এবারও ধান চাষাবাদ করে লাভের মুখ দেখছেন না তারা।

দেখার হাওরের আনোয়ারপুর গ্রামের কৃষক সৈয়দ আলী বলেন, আমি ১০ কিয়ার জমিত ধান করছিলাম। কিন্তু একটা ধানও সরকারি গুদামো দিতে পারছি না। সরকার কয় কৃষকের কাছ থাকি ধান নেওয়া অইবো। কিন্তু আসলে নেয় কার কাছি বুঝি না। আমরা কি তাইলে কৃষক না।

একই হাওরের জানিগাঁও এলাকার কৃষক মনির আহমেদ বলেন, আমরা সরকারের খাদ্যগুদামে ধান দিতে পারি না আবার লটারিতেও আমাদের নাম আসে না। এখন একজনের লগে মাতছি তাই কইসইন ৬০০ টাকা মণ দিবা। এখন বউ বাচ্চা নিয়া চলতে অইলে এই দামেই ধান বিক্রি করা ছাড়া রাস্তা নাই। আমরা চাই সরকার যেন আমাদের দিকে নজর দেয়। আমরার কাছ থকি ধান নিলে আমরা একটু লাভবান অইলাম নে।

কৃষক কাদের মিয়া বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে আমরার ঘরে খাওন নাই, পকেটো টাকা নাই। এখন আমরা চলতে অইলে ওই কম দামেই ধান বিক্রি করতে অইবো। সরকারের কাছে আমরার আকুল আবেদন ধান যেনো ন্যায্য কৃষকের কাছ থকি ক্রয় করা হয়। গুদামে লইয়া গেলেও সরকারের দামে দেয় না তারা। আরও কম দামে কিনতে চায়, আর এক ঘর থকি আরেক ঘর দৌড়াতে দৌড়াতে জীবন নষ্ট।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বাররা আমরার কাছ থাকি কার্ড নিয়া গেছে। আল্লাহ জানেন কার্ডের কি অবস্থা। অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা কইয়া তারা কার্ড নেয় পরে আর তারার খোঁজ খবর পাওয়া যায় না। সরকার এরারে কিচ্ছু কয় না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সফর উদ্দিন বলেন, আমরা সুনামগঞ্জ জেলায় প্রায় ৯২ হাজার কৃষকের তালিকা করে ছিলাম। এখন সবাই তো ধান দিতে পারবে না। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লক্ষ মেট্রিক টন কিন্তু সরকার নিবে ২৫ হাজার ৮৬৬ মেট্রিক টন। তাই বাকিদের বেপারীর কাছে ধান বিক্রি করতে হবে। এছাড়া এখন পর্যন্ত সুনামগঞ্জের হাওরে ৯৮ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়ে গিয়েছে। এবার ধানে উৎপাদন ভালো ছিলো এবং ধানে কোন রোগও ছিল না।

জেলা খাদ্য অফিসের খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মুস্তফা জানান, এবার আমরা দালাল ফড়িয়ার বিরুদ্ধে খুব শক্ত ও কড়াকড়ি অবস্থানে রয়েছি। কৃষকের ধান একমাত্র কৃষকই দিবেন। এখানে অন্য কেউ আসতে পারবে না। তবুও যদি কোন অনিয়মের খবর পাওয়া যায় আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নিবো। এছাড়া আমাদের সরকারের ধান সংগ্রহমাত্রা কিছুটা কম হওয়া আমরা মিল মালিকদের বলেছি কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করার জন্য। তারা আমাদের পরবর্তী চালগুলো দিবেন।

তিনি আরও বলেন, যদি কোনও কৃষক তার কার্ড অন্য কাউকে দেন এবং সেটি প্রমাণ হয় তাহলে কৃষকের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়বে। তার ধান খাদ্যগুদামে নেওয়া হবে না।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, এবার হাওরে ধান অনেক ভালো হয়েছে। বন্যার আগে আমরা ধানগুলো ঘরে তুলতে পেরেছি। আমি পরিকল্পনামন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছি সুনামগঞ্জে সরকারের ধান সংগ্রহমাত্রা যেন বৃদ্ধি করা হয়। সংগ্রহমাত্রা একটু বেশি হলে আমাদের কৃষকেরই লাভ হবে। তারা সুন্দর করে জীবনযাপন করতে পারবেন।

শান্তিবার্তা ডট কম/১১ মে ২০২০/ সৌজন্যে-সিলেটটুডে২৪ডটকম