সুখেন্দু সেন 
করোনা জর্জর পৃথ্বী। কেমন নিঃসঙ্গ লড়ছে গ্রহটি। আহারে! প্রতিবেশী কোনো গ্রহ বা দূর গ্রহান্তরে যদি বুূদ্ধিমান প্রাণী থাকতো তবে নিশ্চয়ই এগিয়ে আসতো। নাকি সামাজিক দূরত্ব মেনে এড়িয়ে যেতো। না না! তা করতো না।

বিশাল বিশাল উড়ালযান বোঝাই ওষুধ পত্তর, মাস্ক, অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর নিয়ে আসতো। বলতো- ভয় নেই ,পৃথিবীর মানুষ। আমরাতো আছি। খবর পেতে কিছু দেরী হলো।এই যা। নইলে আরো আগেই তোমাদের জন্য ছুঠে আসতাম। তোমরা পৃথিবীর মানুষগুলোও কেমন। এত উন্নত বলে দাবী করো আর একটা ইন্টারগ্যালাক্সিক SOS বার্তাও পাঠাতে পারলে না।
আমাদের এক্সটার্নেল কমিন্যুকেশন কন্ট্রোল সিস্টেমেইতো ধরা পড়লো, পৃথিবী নামক গ্রহে কি একটা অস্থিরতা চলছে। প্রথমে আমরা পাত্তা দেইনি। ভাবছিলাম তোমাদেরতো যুদ্ধ টুদ্ধ লেগে থাকে সবসময়। এমনই হয়তো কোনো ফ্যাসাদ। কিন্তু পৃথিবীর সকল প্রান্ত থেকে যখন একই সংকেত পেতে থাকলাম তখন বুঝলাম -এতো ছোটখাটো যুদ্ধ নয়, তাহলে বোধহয় ৩য় বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধ হলে তো আমাদের কিছু করার নেই। সে তোমাদের আভ্যন্তরীন ব্যাপার। মজুদ আনবিক বোমাটোমা ফুটিয়ে, মিসাইল টিসাইল ছুঁড়ে কিছু মরে কমে, শেষে তোমরা নিজেদের মধ্যেই মিটমাট করে নেবে। আগেওতো কয়েকবার তেমন করেছো। তোমাদের জাতিসংঘ না কি যেনো একটা আছে না?
যুদ্ধ আর রাজনীতি নিয়ে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই, চর্চাতেও নেই। এখন দেখছি মারামারি জাতীয় কিছু নয়। মহামারী। একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুজীব সে কি ধুন্ধুমার কান্ড বাধিয়ে দিয়েছে। এতো শক্তিধর তোমরা, অসহায় ভাবে মরছো। তোমাদের নেতারা কেবল বকছে। চিকিৎসকেরা পেরে উঠছে না। বৈজ্ঞানিকেরা চেষ্টা করে যাচ্ছে ঠিকই কিন্ত হয়ে উঠছে না। তোমরা মানুষের মতই নাকি ভাইরাসটির চরিত্র, বড় বিচিত্র। ক্ষণে ক্ষণে রূপ পাল্টায়, আচরণ বদলায়।

তোমাদের অনেক ভালোভালো
বৈজ্ঞানিক আছে, তা জানি। তাদের জন্যইতো তোমাদের পৃথিবী অল্প সময়ে কত এগিয়ে গেছে। একসময় তোমরা গুহাবাসি ছিলে,গাছের ছাল বাকল পরে লজ্জা নিবারণ করতে। তখনও লজ্জা শরমের ব্যাপারটা ছিলো। বনের ফলমূল, পশু মেরে কাঁচা খেতে। তারপর আগুনে পুড়িয়ে। এখন তোমাদের কতো হাই রাইজার বিল্ডিং,কতো বিলাসবহুল আরামদায়ক জীবনযাপন, কত পোষাক পরিচ্ছদ,কত শাড়ি,গহনা, কতো ভালো ভালো খাবার দাবার। তবে খাবারের মধ্যেও নাকি তোমরা প্যাঁচ মারো। ঐ যে কি,জিলিপির মতো। তোমাদের কেউ খেতে পায় কেউ পায় না। কারো অনেক আছে তবু আরো চাই। কারোর আবার কিছু নাই। আর বৈজ্ঞানিকেরা তাদের শ্রম,মেধা দিয়ে যে সেরা আবিষ্কারগুলি করে, তা মানব কল্যানে ব্যবহারের আগেই তোমাদের বিশ্বনেতারা লাগিয়ে দেয় ধংসের কাজে। এ জন্যইতো তোমরা মাঝে মাঝেই খুব বিপদে পড়ো।

তোমাদের কি কোনো সন্দেহ হয়, এতো খবর আমরা জানি কি করে। একটা কথা পরিষ্কার করে বলে রাখি, আমরা কোনো গোয়েন্দাগিরীতে নেই। এ গ্রহের উপর আধিপত্য বিস্তারের কোন আগ্রহ বা ইচ্ছাও নেই। আমাদের বহিঃযোগাযোগ সিস্টেমে শুধু তোমাদের গ্রহ নয়, সৌরজগত নয়, অন্য গ্যালাক্সির গ্রহ, নক্ষত্রপুঞ্জের খবরাখবরও ধরা পড়ে। আর আমরা কিন্তু সৌরজগতের কোনো গ্রহের বাসিন্দা নই। অন্য গ্যালাক্সির। সেখান পর্যন্ত তোমাদের জ্ঞান এখনো পোক্ত হয়নি। ভাসাভাসা কিছু ধারনা আছে মাত্র। তোমরা তো মঙ্গল গ্রহ নিয়ে ব্যস্ত। সেখানে বসতি গড়তে চাও। চাঁদে উপনিবেশ স্থাপন করতে যাও। তা তোমাদের দরকার আছে। যে হারে মানুষ বাড়ছে আর যে ভাবে পৃথিবীটাকে খেয়ে সাবাড় করে দিচ্ছো তাতে এ গ্রহে তোমাদের কুলোবে না।

বলতে বাধা নেই, তোমাদের গ্রহটা কিন্তু খুব সুন্দর। সবুজ প্রান্তর, পাহাড়,নদী,সমুদ্র, বনভূমি। এমন সবুজ কোনো গ্রহ আর কোত্থাও নেই। আমাদের মনিটরে কঁচি সবুজ কমলালেবুর মতো কি সুন্দর ছবি ভেসে উঠতো। কিন্ত বেশ কিছুকাল থেকেই ছবিটা কেমন মলিন ঠেকছে। সবুজের মাত্রা কমে যাচ্ছে। তোমাদের যে একটুখানি নীল আকাশ তাও কেমন ধূসর। ভূ পৃষ্ঠটা তপ্ত তামাটে। তোমাদের বায়ুমন্ডলে যে কার্বন জমছে, ভূপৃষ্ট উষ্ণ হয়ে সব বরফ গলিয়ে দিচ্ছে, তা তোমরা বড় দেরীতে টের পেলে। আফসোস হয়, এমন সুন্দর গ্রহটাকে তোমরা কেমন বানিয়ে ফেলেছো। তোমাদের কপালে আরো কত দুঃখ আছে! সে তোমরা বুঝো গিয়ে।
আমাদের গ্রহটা সবুজ নয়। তোমাদের মত ফসল ফলে না। আমাদের যে বিশাল সূর্য আছে তার আলোক রশ্মি প্রসেস্ করে আমরা খাদ্য তৈরী করি। এটি আমাদের প্রধান খাদ্য। অফুরন্ত রশ্মি, তাও আমরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাইনা। হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম দিয়েও অনেক হালকা খাবার তৈরী হয়। তোমাদের মত ধান,গম,ভুট্টা নেই। তাই কাটাকাটির উৎসবও নেই। আমাদের শরীর স্বচ্ছ,কাঁচের মতো। পোষাকও স্বচ্ছ। তাই তোমরা আমাদের দেখতে পাবেনা। ভাষাও বুঝবে না। তবে আমরা যদি তোমাদের জন্য কাজ করি তখন ভাষা আদান প্রদানের জন্য কয়েকটি অটো ট্রেন্সলেট অডিও সিস্টেম বৈজ্ঞানিকদের কাছে পাঠিয়ে দেবো। তাতে আমাদের ভাষা অনুবাদ হয়ে যার যার মাতৃভাষায় শুনতে পাবে। আর তোমাদের ইংলিশ,ফ্রেঞ্চ, স্পেনিশ,রাশান,চীনা ভাষাগুলিও আমাদের ভাষায় শুনতে পারবো। কোনো অসুবিধা হবেনা।
পৃথিবীর এ অঞ্চলে বাংলা ভাষা নামে একটা সমৃদ্ধ ভাষা আছে ঠিকই, কিন্ত উচ্চতর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বিজ্ঞানে এটি তেমন কাজে লাগেনা। ভাষার জন্য তোমরা মানুষেরা জীবন দাও কিন্ত ভাষাকে ঠিকমত কাজে লাগাতে পারো না। তোমাদের বড় কবিটি কিন্তু এ ভাষাতেই তোমাদের জন্য জীবনের অন্তর্নিহিত বোধ ও উপলব্ধি লিখে রেখে গেছেন। বলাকা কাব্যে বিশ্বজাগতিক গতিবন্দনা ছাড়াও, গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ, নিহারিকার কথাও নাকি আছে। সে ব্যপ্ত জীবন বোধের কিছু না বুঝে, কোনো কিছু ধারণ না করে তোমরা শুধু গান গাও,লেখা কোট করে ডায়লগ আওড়াও, এটা ওটা পালন করো। উৎসবে মাতো। মহামারীটাও তোমাদের কাছে উৎসবের মতো। চুরি না কিযেনো একটা , সেটাও নাকি উৎসবের মতো করো। এই বুড়োটি তোমাদের জন্য অনেক ভালো কথা লিখে গেছে আবার তোমাদের সম্পর্কে অনেক কটু কথাও নাকি আছে। এই যেমন -সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙ্গালি করে মানুষ করোনি। এ নিয়ে এখনও তোমাদের মাঝে কেউ কেউ বেশ উষ্মা প্রকাশ করে। গালি গালাজও করে।
মানুষ, মনুষ্যত্ব আর বাঙ্গালি সম্পর্কে আমাদের খুব একটা ক্লিয়ার ধারণা নেই। তবে কয়েক মুহুর্ত অবস্থানে যা দেখলাম, তোমরা করোনা ভাইরাস ভয় পাও না। জটলা পাকিয়ে ভাইরাসটিকে ডেকে ডেকে আনো। আবার আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে পুত্র বাপের লাশ হাসপাতালে ফেলে পালিয়ে আসে। আক্রান্ত সন্দেহে মাকে বনে ছেড়ে দেয়। মৃতের শেষ কৃত্য করতেও বাঁধা দেয়। তোমাদেরকে দিনরাত চিকিৎসা সেবা দিয়ে যারা অসুস্থ হয়ে পড়ে, দলবেধে তোমরা তাদের বাড়িতে ঢিল ছুঁড়ো। হাসপাতালের নার্সকে বাড়িতে ঢুকতে দাও না। হাঁচি,কাশি,থু থু ফেলার শিষ্টাচারের কোনো বালাই নেই। এই দুর্যোগের সময়েও খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, কালোবাজারী, মজুতদারী, মুনাফালোভ, খাদ্যে ভেজালের কোন কমতি নেই। অবশ্য এ সমস্ত ভেজাল টেজাল বিষাক্ত ক্যামিকেল খেয়ে খেয়ে তোমাদের শরীরে একটা হাই এন্টিবডি তৈরী হয়ে আছে। এ সময়ে এটি একটি প্লাস পয়েন্ট। তবে মানুষ বা বাঙ্গালি নিয়ে আমাদের ধারণা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করবো না। এ তোমাদের ব্যাপার। এসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আমাদের কোন মাথা ব্যথা নেই।

আমরা যে গ্রহটিতে বাস করি সেটি তোমাদের পৃথিবী থেকে অনেক বড়। ৩৬৫ গুন। তোমাদের ৩৬৫ দিনে আমাদের একদিন হয়। ৩৬৫ বছরে আমাদের একবছর। আর আমরা যে কত দূরে আছি তা অনুমান করতেও তোমাদের কষ্ট হবে। সেখানে যাওয়াতো দূরের কথা, যোগাযোগ করার মত প্রযুক্তি আবিষ্কার করতেই তোমাদের হাজার বছর লেগে যেতে পারে। পৃথিবী থেকে কয়েক কোটি বছর আগে আমাদের গ্রহের উৎপত্তি। তাই আমরা অনেক এগিয়ে আছি। আমাদের গ্রহের খুব সুন্দর একটি নাম আছে – কৃস্টালিয়ান। স্বচ্ছ গ্রহ। আর এর বাসিন্দা মানে আমাদেরকে কৃস্টালি বলা হয়। তবে আরেকটি জেনেটিক নামও আছে। তোমরা অনেক যুদ্ধ টুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্বিপাক সামাল দিতে পারলেও এবার যে বেশ বিপদে পড়েছো সেটি আমরা বেশ বুঝতে পেরেছি । মানবতার এমন বিপর্যয়ে আমাদের কৃস্টালিত্ব জেগে ওঠায়, তাইতো ছুঠে আসা।

ভয় পেয়োনা, একটা উপায় নিশ্চয়ই হবে। আমাদের কয়েকজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী একেবারে প্রস্তত হয়ে আছে। বার্তা পেলেই রওনা দেবে। তবে এখানে এসে কাজ করতে গেলে আমাদের বিজ্ঞানী আর কর্মীদের একটি বিশেষ ধরনের পিপিই ও মাস্কের দরকার পড়বে। করোনা ভাইরাস আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবেনা। তবে মানুষের সাথে কাজ করতে গিয়ে যাতে হিংসা আর লোভের ভাইরাসটি আমাদের মধ্যে সংক্রমিত হতে না পারে সে জন্য এ সতকর্তা। আমাদের পিপিই প্রস্ততকারী প্রতিষ্ঠানকে আগেই জানানো হয়েছিলো এগুলি তৈরী করতে। ফিরতি বার্তায় তারা জানালো হিংসা আর লোভ দু’টি বিষয়ে তাদের কোনো ধারনা নেই। আমাদের মনোবিজ্ঞানীরাও এ সম্পর্কে তাদের অসমর্থতার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। সে জন্য আমরা সরেজমিনে এসে এর কিছু সেম্পল পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন আর চিন্তা নেই। হয়তো আমাদের হিসেবের দু’তিন দিনের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা এসে পৌছে যাবে। এ সময়টুকুতে তোমরা মানুষেরা কিছু নিয়ম কানুন মেনে করোনার সঙ্গেই বসবাস করো।সামাজিক দূরত্ব মানার পাশাপাশি জীবন ধারাটাও পাল্টানোর চেষ্টা করো। ইমুনিটি বাড়াও। নিজ নিজ ভাবে নিজে সতর্ক থাকো।
আর একটা কথা বলি- পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের প্রতি আমাদের আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ বিস্তর। তাঁরাও আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। আশা করি এ সময়ের মধ্যেই তাঁরা সফল হতে পারবে।
আমরা চাই কোভিড ১৯ মহামড়কের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানুষই জয়ী হোক। এ গ্রহে মানুষই উড়িয়ে দিক জীবন জয়ের পতাকা।

শান্তিবার্তা ডট কম/১১ মে ২০২০