আব্দুল করিম কিম

এতো দীর্ঘ সময়ের জন্য এভাবে বন্দি হয়ে যাবো ভাবিনি। আমিতো কোন কাজের লোক নই, যারা কাজের লোক- কিছুদিন পূর্বেও যারা কথায় কথায় বলেছেন, মরার সময় নেই; তাঁদেরও এখন অফুরন্ত অবসর। পুরো পৃথিবীর মানুষ আজ থমকে আছে । স্থবির হয়ে গেছে সব ব্যস্ততা, থেমে গেছে জনারণ্যের সমস্ত কোলাহল।

সময়টাতে কারো অবসর বিনোদন হচ্ছে না । আমরা ছুটি বা অবসর পেলে যা করতাম বা করেছি- এর কিছুই এখন করতে পারছি না। প্রতিদিন আসছে বিশ্বজোড়া মৃত্যুর খবর। প্রতিদিন আলোচিত হচ্ছে অনিশ্চিত আগামীর বিপদ। সঙ্গ দেয়া ও সঙ্গ নেয়া মানুষ আমি। যাদের সঙ্গ লাভে আনন্দিত হই- তাঁদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ নেই। আত্মীয়-স্বজনের বাইরেও এই জীবনে কত মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছি কত ভাবে। কত মানুষের সাথে হয়েছে বন্ধুত্বের বন্ধন।

শৈশবের বন্ধু, কৈশোরের বন্ধু, সহপাঠী বন্ধু, সহকর্মী বন্ধু, সহযাত্রী বন্ধু, সহযোদ্ধা বন্ধু, অনুজ বন্ধু, অগ্রজ বন্ধু। এসব বন্ধুদের অনেকের সাথেই ফেসবুকের কল্যাণে সংযোগ আছে। কিন্তু এই সময়ে-এই বয়সে এসে যাদের সাহচর্যে অনুপ্রাণিত হই- এদের খুব মিস করি। যদিও হোয়াটসঅ্যাপ বা ম্যাসেঞ্জারে ভিডিও কলে অনেকের সাথেই গ্রুপ আড্ডা হয় । কিন্তু দেশে-বিদেশে থাকা বিভিন্ন অঙ্গনের প্রিয়জনদের সাথে চলা সব আড্ডাই চলমান বাস্তবতায় শেষতক পরিতৃপ্তির হয় না। উদ্বেগ-আশংকা-হতাশা ও পরামর্শ নিয়েই শেষ হয়।

বৈরি পরিস্থিতিতে অতীতে অন্যের থেকে আশার কথা শুনেছি, অন্যকে আশার কথা শুনিয়েছি। এখন আশার কথা কেউ শোনাতে পারেনা। নিজেও কাউকে আশার কথা শোনাতে পারিনা। কীভাবে পারবো? এই পরিস্থিতির শেষ কোথায়, কেউতো স্পষ্ট করে বলতে পারছে না।

আমার ছেলে-মেয়ের স্কুল বন্ধ। কোথাও যেতে পারছে না। নিচের ফ্লোরে চাচার ঘরেও না। সদ্য কৈশোরে পা রাখা ছেলে মানিয়ে নিয়েছে কিন্তু পাঁচ বছরের মেয়ে দিনে কতবার যে বলে, বাবা ভালো লাগছে না। আমি একটু পূজা দিদির ঘরে যাই? আমি না করলে বলে, তাহলে চাচীমা’র কাছে যাই? নিচেও যেতে দেই না। মনে মনে চিন্তা করি, এই করোনাকাল- আমাদের শৈশব-কৈশোরে এলে কি বিপদ হতো? বাবা-মা আমাকেতো কোনভাবেই ঘরে আটকে রাখতে পারতোনা ।

ক’দিন আগে রাতারগুল থেকে এক মাঝি ফোন দিয়েছিল। রাতারগুলে পর্যটক নেই। সে জানতে চায়, সব কবে ঠিক হবে? কবে আবার পর্যটকেরা রাতারগুলে ভিড় জমাবে? কী জবাব দেবো? আমি নিজেই জানি না। করোনার প্রকোপ শেষ হলেই মাজা ভাঙা মানুষ কি রাতারগুল দেখতে ছুটে আসবে?

আমার খুব কাছের বন্ধুর হোটেল আছে দরগা-ই-হযরত শাহ জালাল (রহ.) প্রাঙ্গণে। দেড় মাস হয়। হোটেল বন্ধ। কর্মচারীদের বেতন দিচ্ছে কিন্তু কতো দিন দিতে পারবে সে জানে না। সে জানতে চায়, কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে? আমি চুপ করে থাকি। আমিতো জানিনা।

আমাদের বাসার গ্রাউন্ড ফ্লোরের একাংশ ভাড়া দেয়া। ভাড়াটিয়া ভদ্রলোক সনাতন ধর্মীয়। দুই মেয়ে ও এক ছেলে সহ পাঁচজনের সংসার। ইন্ডিয়া থেকে কাপড় এনে সিলেটের বিভিন্ন মার্কেটের দোকানে সরবরাহ করে। লকডাউনের মাত্র দশ দিন পূর্বে তাঁর মাল আসে। সেই মাল ডেলিভারি হয় বিভিন্ন দোকানে। কারো থেকে টাকা তোলার আগেই লকডাউন শুরু হয়ে যায়। প্রতি মাসের ১০ তারিখের ভেতর যে কোন ভাবেই তিনি ভাড়ার টাকা পরিশোধ করেন। এপ্রিল মাসের ১৫ তারিখ নিজে থেকে এসে বললেন, দাদা, সব দোকান বন্ধ। কেউ টাকা দিচ্ছে না। আমিতো ভাড়া দিতে পারবো না। সম্ভব হলে, আমাকে কিছু টাকা দিন। ভাড়া না পাওয়ায় কিছুই বলতে পারিনি। উল্টা সামান্য সাহায্য করেছি । মে মাস চলছে। এপ্রিলের ভাড়াও দিতে পারবেন কি না জানিনা। না পেলে কী বলবো?

আমার প্রবাসী বন্ধু- যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে নিজের সমস্ত সঞ্চয় ও ধার-দেনা দিয়ে হাউজিং এস্টেটে পাঁচ তালা স্থাপনা বানিয়ে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল শুরু করেছিল। ওর সেই স্কুল নিয়ে প্রথম আলোতে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আমার দুই সন্তানকে ঐ স্কুলে ভর্তি করিয়েছি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা শ’য়ের ঘরেও পৌঁছেনি। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২০ জন। এখন এদের বেতন দিতে হলে শিক্ষার্থীদের বেতন পাওয়া জরুরি। আমি নিজে এখনো বেতন দেইনি। অনেকেই দেয়নি। যারা দিয়েছে, আগামী মাসে তাঁদের মধ্য থেকে আরও অনেকে দিতে পারবেনা হয়তো। এক দুই মাস আমার বন্ধু কষ্ট করে হয়তো চালিয়ে নিবে কিন্তু কত মাস পারবে?

আমাদের ঘরের গৃহস্থালি কাজে সাহায্যকারী মহিলাকে মার্চের ২২ তারিখ থেকে বিদায় দিয়েছি মাসের বেতনসহ। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই মোবাইল করে জানতে চেয়েছে, আসবে কি না? আমার স্ত্রী না করেছেন। সে বলেছে, সেতো আর কোথাও কাজ পাবে না। এখন সে কী করবে? আমার স্ত্রীকে বললাম, বলে দাও মাসের শেষ সপ্তাহে বরাবরের মত বেতন নিয়ে যেতে কিন্তু এরপরের মাসেও যদি অবস্থা এমন থাকে তাহলে আর কিছু করতে পারবো না। এপ্রিলের টাকা শেষ সপ্তাহে নিয়েছে। এখন মে মাসের বেতন যদি না দিতে পারি, তবে সে কী করবে? সমস্ত জীবন সমাজ ও পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছি। এখনো করতে চাই কিন্তু কিছুই করতে পারছিনা।

কী করবো? আমার টাকা পয়সা থাকলে, তা দিয়ে সাহায্য করতে পারতাম মানুষকে। যদিও সাধারণ মানুষকে সাহায্য করার চেয়ে মনে হয় সরকারকে যদি সাহায্য করতে পারতাম। সাধারণ মানুষের চেয়ে সরকারকে সবদিক থেকে অসহায় মনে হচ্ছে। দেশের নীতি-নির্ধারণীতে কাজ করার সুযোগ থাকলে দৃশ্যমান সমস্ত অব্যবস্থাপনা বন্ধ করতে কাজ করতাম। বর্তমান সময়ের অনেক সাংসদ ও মন্ত্রীদের বালখিল্যতা দেখে নিজেকে এদের চেয়ে যোগ্য ভাবতে সাহস করি।

আমার স্ত্রী ও ছেলে দুজনের শ্বাসকষ্ট আছে। তাঁদের ইনহেলার ইউজ করতে হয়। এদেরকে বিপদে ফেলে ইচ্ছে থাকা সত্বেও বাইরে গিয়ে জনসেবা করাকে ন্যায় সংগত মনে করছিনা। আর এই মুহূর্তে জনসেবাতো ত্রাণ দেয়া অথবা ধান কাটা। ত্রাণ বিতরণের কাজ আমার কোনকালেই পছন্দের কাজ নয়। কিছু মানুষ বিনা দোষে লজ্জাবনত হয়ে অন্যের দান গ্রহণ করবে- যা আমাকে অস্বস্তি দেয়। তাছাড়া আমি মনে করি, ত্রাণ বিতরণের কাজ রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের একাজের জন্য ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় রয়েছে। দুর্যোগকালে রাষ্ট্রের থেকে ত্রাণ পাওয়া বিপন্ন মানুষের অধিকার। মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা দেয়া সরকারের দায়িত্ব। রাষ্ট্র যেন এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে, সে জন্য সুশাসন নিশ্চিতের লক্ষ্যে বিভিন্ন ফোরামে অবিরত কথা বলেছি, লিখেছি। দুঃশাসন দেখলে, দুর্নীতি দেখলে,অব্যবস্থাপনা দেখলে সমালোচনা করেছি। এখনো করছি।

সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন, সিলেট-এর ব্যানারে অসংখ্যবার দুঃশাসন, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করতে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে রাজপথে কর্মসূচির আয়োজন করেছি, অন্যের এমনতর কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি। কিন্তু ত্রাণ বিতরণের কর্মসূচিতে বন্যা বা টর্নেডোকালেও নিজে সম্পৃক্ত হইনি। তবে রোটার‍্যাক্ট ও রোটারি ক্লাব যখন করেছি দু-একবার এমন কাজে অনিচ্ছা সত্বেও যোগ দিতে হয়েছে। যারা এই কাজে অতীতে ও বর্তমানে যুক্ত আছেন তাঁদের প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা ও সম্মান রয়েছে। আমি মনে করি, নিজের সামর্থ্য থাকলে সেই সামর্থ্য নিয়ে নিঃস্ব মানুষের কাছে ছুটে যাওয়া উত্তম কাজ।

এই দুঃসময়ে অনেকেই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষকে সাহায্য করছেন। সাধ্য মত দান করছেন। তবে অন্যের থেকে চাঁদা বা দান সংগ্রহ করে তা বিতরণ করা বড় কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজ সিলেটসহ সারা দেশের অনেকে ব্যক্তি ও সংগঠন করছে। ‘বিদ্যানন্দ’ এমন কাজই করছিল। তাই জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের কাজে অংশ নিয়েছে। যদিও সমাজের কিছু কীটশ্রেণির মানুষ সেই কাজ নিয়েও মিথ্যাচার করেছে। সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডা চালিয়ে একটি ভালো উদ্যোগ নষ্ট করতে চেয়েছে।

করোনাকাল শুরু হতেই বিনামূল্যে মাস্ক ও হ্যান্ড সেনিটাইজার নিয়েও মানুষ মানুষের পাশে ছুটে গেছে। বিনামূল্যে তা বিতরণ করেছে। সিলেটের সংস্কৃতি ও নাট্যকর্মীরা এমন উদ্যোগ নিয়ে করোনাকাল শুরু হতেই মাঠে নেমেছিলেন। এখন সে কাজ আরও বৃহৎ পরিসরে চলছে। প্রায় চার/পাঁচ হাজার পরিবারে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে এবং এখনো অব্যাহত আছে। তাঁদের সাথে এই কাজে আমি সরাসরি যুক্ত হইনি। তবে নিজের পক্ষ থেকে অতি সামান্য কিছু টাকা প্রতীকীভাবে হস্তান্তর করে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছি। সামাজিক ভালো কাজে প্রতীকী ভাবে অংশ নেয়াও মানবতা।

এই প্রতীকী অংশগ্রহণ নিয়ে চমৎকার এক অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করলেন নিউ ইয়র্কের অত্যন্ত জনপ্রিয় গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো। করোনাকালীন যুদ্ধে পৃথিবীতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে মানবিক, দায়িত্বশীল ও জনপ্রিয় একজন নেতা হচ্ছেন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো। সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স মাস্ক ব্যবহার না করে যুক্তরাষ্ট্রের র‍্যাঙ্কিং-১ হাসপাতাল (মায়ো ক্লিনিক) পরিদর্শন করেন এবং রোগীদের সাথে ছয় ফুট সামাজিক দূরত্ব না রেখেই কথাবার্তা বলেন। এই ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো এই ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেন। প্রতিদিনের সংবাদ সম্মেলনে ক্যানসাসের এক কৃষকের পাঠানো হাতে লেখা চিঠি ও একটি এন-৯৫ মাস্ক দেখিয়ে তিনি বলেন, এই কৃষকের পরিবারের সংগ্রহে থাকা পাঁচটি এন-৯৫ মাস্ক থেকে একটি অব্যবহৃত মাস্ক নিউ ইয়র্কবাসীর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের জন্য আমার দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো কৃষকের হাতে লেখা সেই চিঠি পাঠ করে বলেন, হোক মাত্র একটি মাস্ক কিন্তু এই মাস্কই মানবতার সর্বোত্তম নিদর্শন। তিনি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স-এর মাস্ক ব্যাবহার না করে মায়ো ক্লিনিক পরিদর্শন ও রোগীদের সাথে ছয় ফুট সামাজিক দূরত্ব না রেখেই কথাবার্তা বলার সমালোচনা করে বলেন, মাইক পেন্স মানবতার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে মাত্র একটি মাস্ক দান করা ও এক ব্যক্তির মাস্ক না পরে হাসপাতাল পরিদর্শন করা কত গুরুত্বের সাথে আলোচিত ও সমালোচিত হচ্ছে তা দেখে বিস্মিত হয়েছি।

করোনাকালীন এই সময়ে কিভাবে দেশ ও দশের জন্য নিজেকে নিবেদন করতে পারি তা নিয়ে এক অস্থিরতা উপলব্ধি করছি। যদিও এই হোম কোয়ারেন্টিনকালে পরিচিত অনেক স্বল্প আয়ের মানুষকে ব্যক্তিগত ভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। আমার ভাই-বোনদের দেয়া টাকা থেকে এমন কিছু মানুষকে চেষ্টা করেছি সহায়তা করার। এখনো করছি।

লকডাউন শুরু হওয়ার প্রায় সপ্তাহ খানেক পর আমার বাসায় একদল বাঁদরের আগমন দেখে বুঝেছিলাম তাঁদের খাবার সংকট চলছে। শুধু বাঁদর নয়, হোটেল-রেস্তোরা ও কমিউনিটি সেন্টার বন্ধ থাকায় নগরের বেওয়ারিশ কুকুর বেড়ালের খাদ্য সংকট আছে। তাই একদিন চাষনী পিরের মাজারের বাঁদরদের জন্য কলা ও বনরুটি ও নগরের কুকুরের জন্য বনরুটি নিয়ে একদিন ছুটে গেছি। সেই ছুটে যাওয়া ও এদের মধ্যে খাবার বিতরণ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেছি অন্যদের উৎসাহী করার জন্য। ভালো কাজে মানুষ এখনো উৎসাহী হয়। তাই চাষনী পিরের মাজারের বাঁদর ও নগরীর কুকুর বেড়ালের জন্য এখন অনেক ব্যক্তি নিবেদিতপ্রাণে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আশরাফ ভাইয়ের নেতৃত্বে ভূমিসন্তান বাংলাদেশের কর্মীরা, সংস্কৃতিকর্মীরা, আমার ভাগনা পরিবেশকর্মী ওয়াজি প্রতিদিন কুকুরদের খাবার দিচ্ছে। সেই কর্মসূচিতেও সামান্য অর্থ দিয়ে সাথে আছি। মুরগির ঘিলা-কলিজা ও ঠ্যাঙ একশত টাকা কেজি দরে কিনে প্রতিদিন প্রায় আট/দশ কেজি চালের খিচুড়ি রান্না করে কয়েকটি টিমে বিতরণ চলছে। আমি উদ্বোধনী দিনে অংশ নিয়ে খাসদবীর, চৌকিদেখী ও ইলাশকান্দী এলাকায় বিতরণ করি।

এপ্রিলের ২য় সপ্তাহ থেকে আমার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়। ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। পরিচিত চিকিৎসকদের সাথে পরামর্শ করি। কাশি বা গলা ব্যথা নেই। শুধু পেটে ব্যথা বলায় ইউরিন টেস্ট করার পরামর্শ পাই। সেই টেস্টে জানা যায় ওর ইউরিন ইনফেকশন। এন্টিবায়োটিক শুরু হয়। একদিন মেয়ের ঔষধ আনতে ফার্মেসিতে গেলে এক ময়লা কাপড় পরা বয়স্ক ব্যক্তিকে দেখি প্রেসক্রিপশন হাতে। প্রেসক্রিপশন ফার্মেসি সহকারীর হাতে দিয়ে বললেন, সবগুলা ঔষধের দাম বলতে। দাম ১৪৩০টাকা। লোকটা অনেক ভেবে বললো, ৫০০ টাকার মধ্যে যতটুকু দেয়া সম্ভব তাই দেন। ফার্মেসি সহকারী বিরক্ত হয়ে বললো, সবই জরুরি। এখন কী করবো? লোকটার মুখ দেখে অসহায়ত্বটুকু অনুভব করলাম। আসল সমস্যা টাকা। লোকটা প্রেসক্রিপশন নিয়ে চলে গেলো। আমি তখনো সিদ্ধান্তহীন। আমার পকেটে মাত্র ১১৪০ টাকা। অনেক ভেবে লোকটার পেছনে ছুটে গেলাম। লোকটার হাতে আমার থেকে ১০০০ টাকা দিয়ে দিলাম। লোকটা আমাকে কী বলবে, বুঝে উঠতে পারছেনা। সে আমার ফোন নাম্বার চাইলো। বললো, বাবা আমি বড় বিপদে। আমার মেয়ের জন্য ঔষধ কিনতে আসছি। আপনার ফোন নাম্বার থাকলে একটু লিখে দেন। আমি নাগরিক লোক। আবেগের ঠেলায় দিয়ে ফেলেছি। এখন নাম্বার দিলে ফোন করে হয়তো আবারো সাহায্য দিতে বলবে। আমি কিছু না বলে, উল্টা হাঁটা দিলাম। দূর থেকে দেখলাম অন্য ফার্মেসিতে তাঁকে ঢুকতে। হয়তো মনে আশা, এখানে দাম একটু কম হতে পারে অথবা ঐ ফার্মেসির সহকারীকে একটু আগে ৫০০ টাকা আছে বলেছেন। এখন ১৫০০ টাকা দেখে ঐ লোক কী ভাববে?

বাসায় ফিরতে ফিরতে মনটা খচখচ করলো। লোকটা হয়তো এভাবে টাকা নিতে চায়নি, আমার ফোন নাম্বার চেয়েছে, পরে টাকাটা ফেরত দেবে বলে। আবার মনে হয়েছে, মেয়ের অসুখ ভালো হয়েছে সে খবর জানানোর জন্য হয়তো নাম্বার চেয়েছে। বেশি ভাবতে পারিনা। মাথায় আসে ফোন করে আবার সাহায্য চাইলে আমি কী করতাম? কোন ভাণ্ডার থেকে তাঁকে দান করতাম।

মানুষকে দান-খয়রাত করার জন্য আমার জন্ম হয়নি। দান-খয়রাত করতে হলে বিত্তবান হওয়া লাগে। আমি ও আমার বাবা দুজনেই বিত্তবান হওয়ার স্বপ্ন দেখিনি। আমার বাবা দান করতেন। কত দিচ্ছেন, তা নিজেও না দেখে পকেটে যা থাকতো তা দিয়ে দিতেন। সবাইকে দিতেন না। যাকে দেখে তাঁর মনে হতো-এর আসলেই প্রয়োজন তাঁকে দিতেন। পরনের পাঞ্জাবি দান করে হাতাওয়ালা গেঞ্জি পরে বাসায় ফেরার নজিরও রয়েছে আমার বাবার।

ঔষধ কিনতে না পারার এই ঘটনা মনে দাগ কেটেছে। ভাবনায় এসেছে- কত মানুষ অর্থ স্বল্পতার জন্য ফার্মেসি থেকে এভাবে ঔষধ না কিনে ফিরে যায়! কত বাবা হয়তো নিজের জন্য ঔষধ কেনা থেকে বিরত থাকে ঔষধের দাম শুনে। দরিদ্র এসব মানুষের সন্ধান করে করে যদি তাঁদের ঔষধ কিনে দেয়া যেতো। টাকা বা চাল-ডাল মানুষকে যতবার দেয়া হবে ততোবার সে নিতে আসবে কিন্তু ঔষধতো প্রয়োজনেই কিনবে? দরিদ্র মানুষকে ঔষধ দেয়ার জন্য একটি উদ্যোগ যদি নেয়া যেতো।

একদিন বালুচর এলাকার ওঁরাও আদিবাসীদের একজন ফোন দিয়ে বলে, তাঁদের ১৯টি পরিবারের ৯০ জন সদস্যের জন্য কিছু করা সম্ভব কিনা? আমি বিনীতভাবে অপারগতা প্রকাশ করলাম। ঐদিনই সেকুলার বাংলাদেশ ইউকের পুষ্পিতা দি’র সাথে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়। দিদি জানালেন, তাঁরা দেশের বিভিন্নপ্রান্তের প্রান্তিক মানুষদের সাহায্য করছেন। আমি তখন ওঁরাও’দের কথা বললাম। দিদি, সাথে সাথেই জানালেন তিনি টাকা পাঠাচ্ছেন। আমি দিদি’কে জানিয়ে দিলাম ফটোসেশন করতে পারবো না। দিদি বললেন, সমস্যা নেই কিম ভাই।

২০,০০০ টাকা পাঠালেন পুষ্পিতা দি। সেই টাকায় চাল,ডাল, তেল, আলু, আটা ও মিষ্টি লাউয়ের ২৫টি প্যাকেট বানালাম। গণজাগরণ মঞ্চ, সিলেটের মুখপাত্র দেবাশীষ দেবুকে নিয়ে কোন ধরনের ফটোসেশন ছাড়াই ১৯টি ব্যাগ হস্তান্তর করলাম। হস্তান্তরকালে তাঁদের বলেছিলাম, সেকুলার বাংলাদেশ, মুভমেন্ট-এর পক্ষ থেকে এসব আপনাদের জন্য উপহার। বাকি ছয় ব্যাগ দেখে দেখে আরও ছয়টি পরিবারকে দিয়েছি।

আমাদের স্কুল জীবনের একজন শিক্ষক ক্যানসার আক্রান্ত জানতে পেয়ে ঐ শিক্ষকের জন্মদিনে ফেসবুকে একটি পোষ্ট দেই। সেখানে এক লাইনে শুধু বলি, একজন রিটায়ার্ড স্কুল শিক্ষকের জন্য ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। সেই আবেগঘন লেখা পড়ে আমার স্কুল বন্ধুরা এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লক্ষ টাকা পাঠিয়েছে। প্রায় এক লক্ষ আঠারো হাজার টাকা ঐ শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়েছি।

এই লকডাউনকালে একদিন নীলাঞ্জন দাস টুকু’দার ফোন পাই। একজনের রক্ত প্রয়োজন। আমার রক্তদানের চার মাস হয়ে গেছে। তাই ২৮ এপ্রিল রেডক্রিসেন্টে গিয়ে ৭৩তম বার রক্ত দান করলাম। ১৯৯৪ সাল থেকে রক্ত দান শুরু করে এ পর্যন্ত ৭২ ব্যাগ রক্ত নিজের শরীর থেকে দিয়েছি । এ+ আমার রক্তের গ্রুপ। এই শবে বরাতে পরম করুণাময়ের কাছে- আরও ২০ ব্যাগ রক্ত দান করার মত সময় চেয়ে প্রার্থনা করেছি। এক ব্যাগ দেয়া হয়ে গেলো। আরও ১৯ ব্যাগের আয়ু পেলেই চলবে। আমি সেই আয়ু নিয়েই চলে যেতে চাই। দীর্ঘ জীবনের প্রত্যাশা করিনা। তবে যে ক’দিন বাঁচবো- ভয়হীন চিত্তে বাঁচতে চাই।

এই পৃথিবীতে পাওয়ার মত সামগ্রী, দেখার মত সৌন্দর্য ও উপভোগ করার মত বিষয়ের কোন শেষ নেই। এই অশেষ থেকে আমার মত সামান্য মানুষ যতটুকু পেয়েছে- তাই অশেষ। আমার কোন অতৃপ্তি নেই। হ্যাঁ, জীবনে একটা জায়গাতে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। কা’বার কাবা মদিনাতে। এই ইচ্ছা যার কাছে যাবো তাঁর বন্ধু সম্পন্ন করিয়ে দেবেন। তাই ঐ ইচ্ছে নিয়ে আমি ভাবিত নই। আমার ভাবনা অন্য বিষয়ে। কী করতে এসেছিলাম, কী করলাম- এসব ভাবাচ্ছে। জীবন কি কোটি কোটি মানুষের মত অর্থহীন ভাবেই শেষ করে দেবো? খাদ্য গ্রহণ ও প্রজনন-এর বাইরে কী করলাম? কোটি কোটি মানুষ-এই দুই কাজের বাইরে পরিবার পরিজনের জন্য কিছু না কিছু করেছে।

আমিতো পরিবারের জন্যও কিছু করিনি। বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান কারো জন্য কিছুই করা হয়নি। পরিবারের সবাই আমার জন্য করেছে। ভালোবেসে যে কিশোরী বোকার মত আমার হাত ধরেছিল- তাঁর হাতটাও ধরে রাখতে পারিনি। সবার জন্য ভালো হবে ভেবে সে হাত ছেড়ে দিয়েছি।

স্বার্থপরের মত যা করেছি, তার সবই নিজের জন্য। নিজের যা করতে ভালো লেগেছে তাই করে গেছি। পড়াশোনা করতে ভালো লাগেনি, তাই মাঝপথেই পড়া বন্ধ করেছি । চাকুরি করতে ভালো লাগেনি, তাই চাকুরিতে ঢুকেও ছেড়ে দিয়েছি। ব্যবসা করতে ভালো লাগেনি, তাই ব্যবসায় যুক্ত হয়ে মনে-প্রাণে তাও করিনি। রাজনীতি করতে ইচ্ছে করেনি, তাই রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হতে পারিনি। ধর্ম-কর্ম করতে ইচ্ছে করেনি, তাই ধর্মে সম্পূর্ণ বিশ্বাস থাকা স্বত্বেও ধর্ম-কর্ম করতে পারিনি। তাহলে করলামটা কী? কিছুই করা হয়নি তবে অধর্ম করিনি। সজ্ঞানে কাউকে প্রতারিত করিনি। অন্যের প্রাপ্যে লোভ করিনি। নিজের স্বার্থে কারো ক্ষতি করিনি।

জীবনভর সমাজের সামগ্রিক মঙ্গলের জন্য কাজ করতে চেয়েছি। এই করতে চাওয়াটাই আমার কাজ ছিল। তাই-ই করেছি। শুধু করতে চেয়েছি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সিলেট ও সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার থেকে নদীর জন্য করতে চেয়েছি, পাহাড়ের জন্য করতে চেয়েছি, পাখির জন্য করতে চেয়েছি, জলাশয়ের জন্য করতে চেয়েছি, বনাঞ্চলের জন্য করতে চেয়েছি, বৃক্ষের জন্য করতে চেয়েছি। চেয়েছিই শুধু- কিছুই করতে পারিনি। না পারার কারণ মানুষ।

মানুষেরাই নদী-পাহাড়-বন-জলাশয়-পাখির অধিকার হরণ করেছে। প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য অধিকাংশ মানুষই দায়ী। আমি নিজেও দায়ী। যে নদী দূষণ করে সে হয়তো বৃক্ষরোপণ করে। যে পাহাড় কাটে, সে হয়তো পুকুর খনন করে। যে জলাশয় ভরাট করে, সে হয়তো বন্যপ্রাণির সেবা করে। এভাবে কোন না কোন ভাবে মানুষেরা ভালো করার পাশাপাশি প্রাণ-প্রকৃতির ক্ষতি করে গেছে। আর মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে মানুষের। অন্য মানুষের সম্পদ হরণ করে, অন্যকে ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে কিছু মানুষ পৃথিবীতে তথাকথিত ভাবে সফল হওয়ার বড়াই করেছে। মানুষকে এমনতর কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য, সংশোধন করার জন্য ধর্ম এসেছে। সেই ধর্মের দোহাই দিয়েও কিছু মানুষ মানুষকে শোষণ করেছে, শাসন করেছে, অবজ্ঞা করেছে, নিপীড়ন করেছে, নির্যাতন করেছে। এইসব মানুষের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। বলার চেষ্টা করেছি। অন্যায় ও অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে বলাকে কেউ সমাজের বিরুদ্ধে, কেউ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, কেউ ধর্মের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে প্রমাণ করতে চায়।

“এই যে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধের নামে শুরু থেকে অদ্যাবধি যা হয়েছে বা হচ্ছে তা নিয়ে সমালোচনা করা কি রাষ্ট্রের সমালোচনা? নিজের প্রাণ বাঁচানোর স্বার্থে ভুল ধরিয়ে দেয়া কি অন্যায়? আরিচার রাস্তায় অদক্ষ ড্রাইভার দক্ষতার ভান করে যদি বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালায়- চালককে কি সাবধানে গাড়ি চালাতে বলবোনা? সে কথাতো বলবো। ড্রাইভার-হেলপার সবগুলারে প্রয়োজনে গালিও দেবো। ড্রাইভার-হেলপার যদি ভালো হয় শুনবে। আর যদি অমানুষ হয় তবে আমাকে গাড়ি থেকে হয়তো ছুঁড়ে ফেলে দেবে। যদি দেয়, দেবে। মরে যাওয়া মানেই মরে যাওয়া নয়, বেঁচে যাওয়াও।”

আব্দুল করিম কিম, সমন্বয়ক, সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও প্রকৃতি রক্ষা পরিষদ।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। shantibarta.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে shantibarta.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।