ডাঃ ফাহমিদা খাতুনঃ

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের জন্য ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশে লকডাউন বজায় রয়েছে। অবশ্য সরকারিভাবে এটিকে সাধারণ ছুটি হিসাবে বলা হচ্ছে। দেশের সকল অফিস এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কিন্তু ঘরে থেকেই প্রায় সকলে অফিসের কাজ করছেন। খাদ্য ও ওষুধ কেনার মতো জরুরি প্রয়োজন ছাড়া জনগণকে ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি নেই। এই রোগের ভয়াবহতা চিন্তা করে এবং ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে কোভিড-১৯ এর দ্রুত বৃদ্ধির আশঙ্কার কথা বিবেচনা করে সরকার যথার্থ সিদ্ধান্তই নিয়েছে। যেহেতু এই রোগের কোনো প্রতিষেধক এখনো বের হয়নি, তাই অন্যান্য কোভিড-১৯ আক্রান্ত দেশগুলোও এই রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় হিসাবে সামাজিক দূরত্বের ওপর জোর প্রদান করেছে। বাংলাদেশও সেটি অনুসরণ করেছে।
এক মাসের বেশি সময় ধরে চলমান লকডাউন জনজীবনকে যেমন স্থবির করে তুলেছে, তেমনি অর্থনীতিতেও নানাভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় কৃষকেরা তাদের পণ্য রাস্তায় ফেলে দিতে বা পানির দামে তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। বেশির ভাগ বছরের মতো এই বছরেও বোরোর ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু এই মহামারির ফলে কৃষকেরা তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন কিনা তা নিয়ে চিন্তিত।
লকডাউনের সময়ে দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল মানুষ, এমনকি স্বল্প আয়ের মাসিক বেতনভুক্ত মানুষের আয়ের পথও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। যেহেতু দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, তাই এখন তাদের হাতে কোনো টাকা নেই। এত কম আয় করে তারা কখনো কোনো সঞ্চয়ও করতে পারে না কিংবা তাদের সঞ্চয় অত্যন্ত কম। যার ফলে সংকটকালীন এই সময়ে জীবনধারণের জন্য তাদের তেমন কিছুই নেই। এর মধ্যে যারা আছেন তাদের তালিকাটি অনেক বড়। শ্রমিক, রিকশা এবং ভ্যান চালক, স্কুটার ও ট্যাক্সি চালক, অন্যান্য পরিবহন শ্রমিক, ছোট দোকানদার, রাস্তার বিক্রেতা, নাপিত, বিউটি পারলারের কর্মী, আবর্জনা তোলার শ্রমিক, খণ্ডকালীন গৃহকর্মী, ইট ভাটা শ্রমিক, ছোট ওয়ার্কশপগুলোতে কাজ করা শ্রমিক, রাস্তার পাশের খাদ্য বিক্রেতা, হোটেল এবং রেস্তোরাঁ শ্রমিক, ব্যক্তি পর্যায়ে কাজ করা বা বাণিজ্যিক ড্রাইভার, পণ্যবাহী শ্রমিক, কাঠ মিস্ত্রি, ই-কমার্সের ডেলিভারি কর্মী এবং আরও অনেক অনানুষ্ঠানিক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এখন বেশির ভাগ উপার্জনহীন। এ ছাড়াও সমাজের পেশাহীন মানুষ, যেমন ভিক্ষুক, পথশিশু, প্রতিবন্ধী, দরিদ্র স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা, বিধবা এবং হিজড়া সম্প্রদায়ের অন্তর্গত গরিব মানুষ অভাবের মধ্যে দিনযাপন করছে।
সুতরাং, দেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই লকডাউন পরিস্থিতিতে অন্য আরেক ধরনের অর্থাৎ জীবিকার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। লকডাউন তাদের কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে হয়তো রক্ষা করছে, কিন্তু তারা প্রচণ্ড দারিদ্র্য এবং ক্ষুধায় আক্রান্ত। চীন ও অন্যান্য কয়েকটি দেশ সরবরাহব্যবস্থা অনেকখানি ফিরিয়ে আনতে পারায় এবং স্বল্প আয়ের মানুষের মাঝে খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছিল বলেই লকডাউন পরিস্থিতি সফল ভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছে।
এই অবস্থা বিবেচনা করে সরকার সম্প্রতি লকডাউন কিছুটা শিথিল করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রেস্তোরাঁ থেকে খাদ্য ডেলিভারি এবং রপ্তানি খাতের শিল্প-কারখানা। আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থায় লকডাউনের মাধ্যমে জীবন বাঁচানো নাকি লকডাউন তুলে দিয়ে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ দেওয়া—এ দুটি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটির মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়া কষ্টকর। স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যাপারটি অবশ্যই সবার আগে বিবেচ্য। কিন্তু লকডাউনের সময়ে তাহলে তারা বাঁচবে কীভাবে। যতই লকডাউনের সময়সীমা বাড়বে, ততই মানুষের জীবিকার ওপর চাপ বাড়ছে। অভাব ও ক্ষুধার তাড়নায় অনেকে মারাও যেতে পারে এমন আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় একমাত্র অর্থনৈতিক ত্রাণ সরবরাহ করে তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের ফলে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হার ২০.৫ শতাংশ থেকে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছে গেছে আলোচনায় এসেছে। সুতরাং, এই জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে বিপুল পরিমাণে সরকারি সহায়তা প্রদান করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সেখানে সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানোর জন্য ৬,৮৫৯ কোটি বা মোট প্রণোদনা প্যাকেজের মাত্র ৭.১ শতাংশ রাখা হয়েছে। এটি একেবারেই অপ্রতুল। যদিও বলা হচ্ছে সামাজিক সুরক্ষার জন্য চলতি অর্থবছরে ৭৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা তো রাখাই আছে। কিন্তু সেটি স্বাভাবিক সময়ের জন্য। আর সেখানে মাথাপিছু বরাদ্দের পরিমাণ অনেক কম। আর এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। অভাবী মানুষের সংখ্যা কোভিড-১৯ এবং লকডাউনের কারণে মানুষের প্রয়োজন অনেক বেশি। তাই সরকারকে স্বাস্থ্য সেবা বাড়ানোর পাশাপাশি এদেরকে খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা সরবরাহ করা বিশেষ প্রয়োজন। কারণ প্রথমত, এটি দিয়ে তারা তাদের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, পণ্য সরবরাহ করতে গেলে অনেক নিয়ম ভাঙার খবর থাকে, স্বচ্ছতার অভাব থাকে। তৃতীয়ত, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি নগদ অর্থ দিলে দুর্নীতির সুযোগ কম থাকে। কিন্তু চাল ও অন্যান্য পণ্যের অনিয়ম বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। চতুর্থত, সরাসরি নগদ স্থানান্তরের জন্য লোক জড়ো হওয়ার প্রয়োজন হবে না এবং কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে। পঞ্চমত, নগদ অর্থ সহায়তা অর্থনীতির ওপর গুণক প্রভাব তৈরি করে। অর্থাৎ এই অর্থ দিয়ে চাল-ডালের বাইরে অন্যান্য পণ্য কেনার মাধ্যমে সামগ্রিক চাহিদা বাড়বে, যেটি এই মুহূর্তে খুব দরকার।
চলমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা যায়, এই নগদ স্থানান্তর প্রক্রিয়া কমপক্ষে তিন মাসের জন্য হওয়া উচিত। আশার কথা যে স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যে সহায়তা প্রয়োজন এমন ব্যক্তির তালিকা প্রস্তুত করছে। তবে বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির যে তালিকা রয়েছে সেখানে ভুলভ্রান্তি রয়েছে। অর্থাৎ যাদের সহায়তা দরকার নেই, তারাও অনেকে তালিকায় রয়েছেন। আবার যাদের সহায়তার দরকার তারা তালিকায় নেই। তা ছাড়া শহরে বসবাসরত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এ জাতীয় কোনও তালিকা নেই। সুতরাং, কোভিড-১৯ ‘এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র লোকদের তালিকা গঠনের প্রক্রিয়াটি অবশ্যই যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ হতে হবে।
প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রস্তাবিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত যেখানে আর্থিকভাবে দুর্বল ও প্রান্তিক ব্যক্তিরা তাদের অন্তর্ভুক্তির জন্য নিজেরাই আবেদন করতে পারেন। কয়েকটি হটলাইন নম্বর বরাদ্দ করা উচিত যাতে বাদ পড়া নাগরিকেরা সহায়তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য ফোন করে আবেদন করতে পারেন। স্বচ্ছতার জন্য অভাবী মানুষদের এই তালিকাটি সরকারের প্রাসঙ্গিক মন্ত্রণালয়, যেমন অর্থ, সমাজকল্যাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা উচিত।
সহায়তার সমস্ত ব্যবস্থাগুলি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থাও থাকা বিশেষভাবে প্রয়োজন। বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও এবং স্থানীয় পর্যায়ের অনেক সংস্থাকে তালিকা প্রস্তুত এবং ত্রাণ বিতরণে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হলে সকলের এই কার্যক্রমে অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। কোভিড-১৯ সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বর্তমানে এনজিও এবং অনেক ব্যক্তিবর্গ এগিয়ে এসেছেন। অবদান যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, এই সংকটাপন্ন অবস্থায় সরকারের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার জন্য সকলকেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।


ডঃ ফাহমিদা খাতুন : নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

শান্তিবার্তা ডট কম/২ মে ২০২০/সৌজন্যে- প্রথম আলো