পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ এমপি   

আগাম বন্যার আশংকায় দ্রুত ধান কাটা চলছে ।
দম ফেলার সুযোগ নেই সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর।সারা বছরের স্বপ্নের ফসল এই বোরো ধান বন্যার শংকায়।বাংলাদেশ এবং ভারতের অাবহাওয়া অধিদপ্তরের অাবহাওয়ার পুর্বাভাস ভাল নয়।শংকিত কৃষকেরা।অাবহাওয়ার পুর্বাভাসে বলা হয়েছে দেশের উত্তর পুর্বঞ্চলে এবং ভারতের আসাম,মেঘালয়, ত্রিপুরা ও বরাক অববাহিকায় মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে।সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বললেন এই বৃষ্টিপাত ২৭এপ্রিল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।যেকারনে সিলেট, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ এবং হবিগঞ্জ জেলার নদীসমুহের পানি বিপদসীমা অতিক্রম করবে।সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৪-৬মিটার বৃদ্ধি পাবে।এটি হলে আমাদের বিপদের আশংকা। নিকট অতীতেও সীমান্তের ওপার থেকে আসা পাহাড়ী ঢল অার সুরমার পাড় তলিয়ে ফসলহানী ঘটেছে। এবার ফসল রক্ষার ডুবন্ত বাঁধ নির্মানে সুনামগঞ্জে ব্যায় করা হয়েছে ১৩২ কোটি টাকা। পিআইসির মাধ্যমে এসব বাধের কাজ করানো হয়েছে। বাধের বরাদ্দের পরিমান অনেক।সরকার প্রচুর টাকা দিয়েছে। বাধের কাজে জড়িত পিআইসি গুলো নিয়মিত বাধ মনিটরিং করতে হবে।এত বিশাল অংকের টাকার বাধ যেন পানির প্রথম স্পর্শেই তলিয়ে না যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডও পিআইসির সাথে সক্রিয় থাকুন। এই ধান হাওরবাসীর প্রাণ।

২০১৭ সালে ফসলহানীর পর মহামান্য রাস্ট্রপতি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানুষের কষ্টে পাশে এসে দাড়িয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী মানুষকে ব্যাপক খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন। জেলায় এবার বোরো ফসলের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৩ লক্ষ মেট্রিকটন।অামার নির্বাচনী এলাকা সুনামগঞ্জ সদরে ৯৪হাজার ৭শত ২৪মেট্রিকটন এবং বিশ্বম্বরপুর উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা ৬১ হাজার ৫শত ৯৮মেট্রিকটন। যদিও বিশ্বম্বরপুর উপজেলার অনেক মানুষের জমি তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওরে। বন্যার আশংকা থাকায় মানুষ দিন রাত পরিশ্রম করছেন হাওরে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ফসল নিরাপদ করার বিষয়ে আন্তরিক। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে। ধান কাটা, মাড়াইয়ের জন্য জেলায় নুতন ৪০টি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার মেশিন দেয়া হয়েছে। নুতন ৪০টি সহ জেলায় ১১৪টি হার্ভেস্টার মেশিন এবং ১১৭টি রিপার মেশিন ধান কাটায় ব্যাবহার করা হচ্ছে। কৃষিমন্ত্রী ড.আব্দুর রাজ্জাকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসেন। ধানকাটা শ্রমিকের জন্য টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ সহ বিভিন্ন জেলায় তিনি যোগাযোগ করেন। লকডাউনের মধ্যে ও ধান কাটা শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে ফোনে নিশ্চিত করেছিলেন কয়েকদিন আগে।

গতকাল ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত জেলার বাহির থেকে আসা ধান কাটা শ্রমিক রয়েছেন ১০হাজার ৬শ ৯৪জন। বিষয়টি আমাকে নিশ্চিত করেন সুনামগঞ্জে কৃষিসম্প্রসারণ বিভাগের উপ পরিচালক মোঃ সফর উদ্দিন।
আশংকার মধ্যেও একটি ভাল দিক হল আবহাওয়ার পুর্বাভাস অনুযায়ী সুনামগঞ্জ অঞ্চলে বৃস্টিপাত হয়নি। পুর্বাভাস ছিল ১৭-২১ এপ্রিল পর্যন্ত এলাকায় বৃষ্টিপাত হবে ২২০ মিলিমিটার। সুসংবাদ হল সেটি হয়নি। ২৪এপ্রিল বৃষ্টিপাত হয়েছে ১১মিলিমিটার। এটি আমাদের জন্য ভাল।
তবে এবার ধান কাটা নিয়ে জেলার সমস্ত শ্রেনী পেশার মানুষ আন্তরিক ভুমিকা রাখছেন। জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ প্রতিদিন হাওরে ছুটে যাচ্ছেন। ২৩এপ্রিল রাতেও জেলা প্রশাসক সদর উপজেলার একটি হাওরে নিজে অংশ নিয়ে উৎসাহ প্রদান করেন। ঘোষনা অনুযায়ী ধানকাটা শ্রমিকদের ত্রান দিচ্ছেন। জেলা-উপজেলা প্রশাসন দিনরাত ছুটে যাচ্ছেন হাওরে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ হাওরে যাচ্ছেন।উৎসাহ প্রদানের জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং জনপ্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন। ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক পার্টি, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সংঠগনের নেতা কর্মিরা অংশ নিচ্ছেন। রোভার স্কাউট ছুটে গিয়ে কৃষকের ধান কেটে দিচ্ছেন। আমার নির্বাচনী এলাকার ইউনিয়ন চেয়ারম্যানরা নিয়মিত শ্রমিকের বাইরে উনাদের উদ্যোগে ধান কাটা শ্রমিক সংগ্রহ করেছেন। গ্রাম পুলিশরা অংশ নিচ্ছেন ধান কাটায়। পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানের উদ্যোগে শাল্লায় এক কৃষকের ধান কেটেছেন পুলিশ।
অনেক রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ধান কাটায় অংশ নিয়েছেন। মানুষকে উৎসাহ প্রদানের জন্য যারা এই ধান কাটায় অংশ নিয়েছেন আপনাদের শ্রদ্ধা এবং অভিনন্দন জানাই।প্রশাসন, জনপ্রতিনিধির বাইরে অনেক সংগঠন নিয়মিত মাইকযোগে প্রচারনা চালাচ্ছেন। স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী অংশ নিয়ে দ্রুত ধান কাটতে। তারা সবাই আন্তরিকতার সাথে কাজ করছেন কৃষি এবং কৃষকের জন্য। আমাদের খাদ্যের জন্য।
আমাদের কৃষকরা বিআর ২৯জাতের ধান করেন বেশী ফলনের আশায়। এই জাতের ধান পাকতে সময় নেয় একটু বেশী। বিআর২৮কাটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিআর ২৯ অনেক জায়গায় এখনও কাটার উপযুক্ত হয়নি। মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের এক কৃষক জানালেন মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময় পেলে পুরো পাকা ধান তুলে নিতে পারতাম। তবে শংকার বিষয় হল বৃষ্টিপাত আমাদের সে পর্যন্ত সময় দিবে কি না? কাজেই কিছু ক্ষতি স্বীকার করেও দ্রুত কেটে ফেলতে হবে। জেলা প্রশাসনও দ্রুত ধানকাটার জন্য প্রচারনা করে যাচ্ছেন। হাওরের মানুষ এবার বড় সমস্যায় দিন কাটাচ্ছেন। বন্যার আশংকা আর করোনার ভয় নিয়ে কঠিন সময় পার করছেন। দেখতে দেখতে জেলায় ১৫জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল ২৪এপ্রিল সদর হাসপাতালের একজন ডাক্তারের শরীরে করোনা পজিটিভ এসেছে পরীক্ষায়। সবাইকে অনুরোধ করব স্বাস্থ্য সেবার প্রয়োজনে আপাতত হাসপাতালে যাবার আগে হাসপাতালের ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে হাসপাতালে যাবেন। স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে আমি কথা বলেছি।
আমরা একটি কঠিন সময় পার করছি। তবে হাওরের মানুষেরা প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে লড়াই করা মানুষ। হাওরের আফালের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া মানুষ আমরা। এবারের লড়াইতেও হাওরবাসী জয়ী হবে নিশ্চয়। পবিত্র রমজান মাসে পরম দয়ালু আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
২৫.০৪.২০