শিরোনাম


শান্তিবার্তা বিশেষ প্রতিনিধিঃ

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় বুধবার রাতভর পৃথক দুটি অভিযানে কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারীর বাড়ি থেকে সরকারি ত্রাণের ১৮৪ বস্তা চাল উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এছাড়াও জেলেদের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির চাল মাপে কম দেওয়ার অভিযোগে একই ইউনিয়নের দুই মেম্বারকে একমাস করে বিনাশ্রম কারাদন্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমান আদালত। দন্ডিতরা হলেন- উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৬নং ওয়ার্ড সদস্য জাকির হোসেন এবং ৮নং ওয়ার্ড সদস্য রোকনুজ্জামান রোকন।

বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ভ্রাম্যমান আদালতের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সুজিত হাওলাদার বুধবার সন্ধ্যায় এ দন্ডাদেশ দেন। বিকেলে কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদে জেলেদের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির চাল বিতরণকালে বরিশাল র‌্যাব-৮’এর একটি অভিযানিক দল তাদের আটক করেন। এসময় মৎস্যজীবী প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে ৪০ কেজি চালের পরিবর্তে ৩০ কেজি করে বিতরণ করার সময় তাদের হাতেনাতে আটক করা হয় বলে জানায় র‌্যাব।

এসময় আটককৃতদের স্বীকারোক্তি ও কার্ডধারীদের অভিযোগের ভিত্তিতে কেদারপুর ইউপি চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারীর স্টিমারঘাটের বাড়িতে বিপুল পরিমান আত্মসাৎকৃত সরকারি চাল মজুদ আছে মর্মে নিশ্চিত হয় র‌্যাবের ওই অভিযানিক দলটি। পরে ইউপি চেয়ারম্যান নুরে আলম বেপারীর বাড়িতে রাতভর অভিযান চালিয়ে ১৮৪ বস্তা সরকারি চাল উদ্ধার করে র‌্যাব-৮ সদস্যরা। তবে র‌্যাবের অভিযান টের পেয়ে আগেই আত্মগোপন করেন অভিযুক্ত কেদারপুর ইউপি চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারী। এ ঘটনায় ত্রাণের চাল আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার সকালে বাবুগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করে র‌্যাব।

অভিযানের নেতৃত্ব দেয়া র‌্যাব-৮’এর সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মুকুর চাকমা বলেন, ‘প্রথম দফায় ওজনে চাল কম দেয়ার অভিযোগ পেয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় দুই মেম্বারকে হাতেনাতে আটক করা হয়। তারা জেলেদের জন্য নির্ধারিত জনপ্রতি ৪০ কেজি চালের পরিবর্তে ৩০ কেজি করে দিচ্ছিলেন। ২ মাসের বরাদ্দ থেকে জনপ্রতি ১০ কেজি করে মোট ২০ কেজি চাল প্রত্যেক জেলেকে কম দেয়ার কথা স্বীকার করেন আটককৃত ইউপি সদস্য জাকির হোসেন এবং রোকনুজ্জামান। তারা বলেছেন, কেদারপুর ইউপি চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারী প্রত্যেক কার্ডধারীকে দুই মাসের মোট প্রাপ্য ৮০ কেজি চাল থেকে ২০ কেজি করে চাল কম দিতে বলেছেন এবং চুরির অর্ধেক ভাগের অংশ (জনপ্রতি ১০ কেজি করে) হিসাব করে ৫৯৩ জেলে কার্ডের চাল তিনি বিতরণের আগেই নিজের বাড়ির গোডাউনে রেখে দিয়েছেন।’ র‌্যাব-৮’এর ওই অভিযানিক কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দুই মেম্বারের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তাদের আটক করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পরিচালিত মোবাইল কোর্টে সোপর্দ করা হয়।’

বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুজিত হাওলাদার বলেন, ‘নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে ওজনে কম চাল দেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ওই দুই মেম্বারকে একমাস করে বিনাশ্রম করাদন্ড প্রদান করা হয়েছে। তবে যেহেতু চেয়ারম্যানকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি তাই তার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি।

এদিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার তার কেদারপুর ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়িতে চাল মজুদের বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও অভিযোগ পেয়ে র‌্যাব-৮ সদস্যরা সেখানে অভিযান চালান। ইউপি চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারীর মালিকানাধীন স্টিমারঘাটের বাড়িতে বিপুল চালের মজুদ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে রাতভর অভিযান পরিচালনা করেন তারা। তবে সেখানে কাউকে না পেয়ে পরে স্থানীয় ইউপি সদস্য ইদ্রিস কবিরাজের উপস্থিতিতে ঘরের তালা ভেঙে প্রবেশ করে বিপুল পরিমাণ সরকারি চাল মজুদ দেখতে পান র‌্যাব সদস্যরা।

এসময় ওই চাল আবার তালাবদ্ধ করে রেখে চালের উৎস সন্ধানে তদন্তে নামে র‌্যাব। সাজাপ্রাপ্ত দুই মেম্বারের স্বীকারোক্তি ছাড়াও এসময় সেখানে উপস্থিত বেশকিছু কার্ডধারীকে চাল না দেয়ার অভিযোগ তদন্ত করেন তারা। প্রায় ৪ ঘন্টার তদন্ত শেষে চাল আত্মসাতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরে আবার রাত ১১টার দিকে চেয়ারম্যানের বাড়িতে দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালায় র‌্যাব। এসময় চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে ১৮৪ বস্তা সরকারি চাল উদ্ধার করা হয়।

দ্বিতীয় দফায় অভিযানে চেয়ারম্যানের ঘর থেকে চাল উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে অভিযানে নেতৃত্ব থাকা র‌্যাবের সহকারী পুলিশ সুপার মুকুর চাকমা বলেন, ‘ত্রাণের চাল নিয়মানুযায়ী সরকারি গোডাউনে নতুবা ইউনিয়ন পরিষদে থাকার কথা থাকলেও ওই চাল আত্মসাতে উদ্দেশ্যে চেয়ারম্যানের বাড়িতে মজুদ করা হয়েছে মর্মে অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পরে রাতে ওই চাল জব্দ করা হয়। পরে ইউপি মেম্বারসহ স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে চাল গণনা করে মোট ১৮৪ বস্তা পাওয়া যায়।’

বাবুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মিজানুর রহমান জানান, খবর পেয়ে যৌথ অভিযান চালিয়ে কেদারপুর ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে ১৮৪ বস্তা চাল উদ্ধার ও জব্দ করা হয়। এসময় সরকারি ত্রাণের চাল আত্মসাতের অভিযোগে ইউপি চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারীকে আসামী করে বৃহস্পতিবার সকালে বাবুগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করে র‌্যাব। তবে অভিযানের আগেই পালিয়ে যাওয়ায় তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে এ ঘটনার পরে অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারী পলাতক থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে (০১৭৪০-৬২৯৫৩৩) ঘটনার পর থেকে অসংখ্যবার কল করা হলেও সেটা বন্ধ পাওয়া যায়।

শান্তিবার্তা ডট কম/১৬ এপ্রিল২০২০/বটা/প্র