শিরোনাম


১৪২৬ বঙ্গাব্দের শেষ দিন আজ। বাংলার রীতি অনুসারে বর্ষ বিদায়ের বিশেষ দিন চৈত্রসংক্রান্তি। কবি জীবনানন্দের ভাষায়, ‘পুরনো সে-নক্ষত্রের দিন শেষ হয়/নতুনেরা আসিতেছে বলে…।

আসছে নতুন বছর ১৪২৭ বঙ্গাব্দ। আগামীকাল মঙ্গলবার (১৪ই এপ্রিল) বর্ষবরণের দিন পহেলা বৈশাখ। এ কারণেই জীর্ণ পুরাতনকে বিদায় আর নতুনকে বরণের প্রস্তুতিতে আজ মুখর থাকার কথা বাংলাদেশ আর পাশের দেশ ভারতের বাঙালি অধ্যুষিত জনপদগুলো। কিন্তু মরণব্যাধি করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবের কারণে জনসমাগম এড়ানোর জন্য বর্ষ বিদায় ও নববর্ষ বরণের সব অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।

বাংলা সনের সমাপনী মাস চৈত্রের শেষ দিনটি সনাতন বাঙালির লৌকিক আচারের চৈত্রসংক্রান্তি। রাজধানীতে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও গানের দল সুরের ধারা দিনটি ব্যাপক আয়োজনে উদযাপন করলেও এবার কোনো আয়োজন নেই। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে সুরের ধারার চৈত্রসংক্রান্তির অনুষ্ঠান রাতভর চলার পর শেষ হয় হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণের মধ্য দিয়ে। এবার এ অনুষ্ঠানটি হচ্ছে না।

নাগরিক জীবনে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরোধা সংগঠন ছায়ানটও তাদের ঐতিহ্যবাহী রমনা বটমূলের প্রভাতি অনুষ্ঠান বাতিল করেছে। তবে রমনা বটমূলের বিগত কয়েক বছরের অনুষ্ঠানগুলোর ভিত্তিতে একটি ধারণকৃত অনুষ্ঠান বিটিভি প্রচার করবে। এ প্রসঙ্গে ছায়ানট সভাপতি সন্জীদা খাতুন বলেন, “বর্তমান মহামারিতে বিশ্বজুড়ে অগণ্য মানুষের জীবনাবসান ও জীবনশঙ্কার ক্রান্তিলগ্নে ছায়ানট এবার ‘উৎসব নয়, সময় এখন দুর্যোগ প্রতিরোধের’ এই অঙ্গীকার নিয়ে সীমিত আকারে অনুষ্ঠান উপস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।” বাংলাদেশ টেলিভিশন (১৪ই এপ্রিল) সকাল ৭টায় অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করবে। বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে ছায়ানট সভাপতি সন্জীদা খাতুনের সমাপনী কথন যুক্ত করা হয়েছে। বিটিভি ছাড়াও অনলাইনে ছায়ানটের  (http://bit.ly/Chhayanaut) ইউটিউব চ্যানেল থেকে অনুষ্ঠানটি উপভোগ করা যাবে। প্রথমে শারীরিক দূরত্ব মেনে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে তা বাতিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

১৯৬১ সালে যাত্রা শুরু করা ছায়ানট ১৯৬৭ সাল থেকে প্রতিবছর রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখের ভোরে বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে আসছে। এর আগে মাত্র একবার মুক্তিযুদ্ধকালে অনুষ্ঠানটি হয়নি। এবার দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে।

বাংলা বর্ষবরণের আরেক ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠানকে জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইউনেসকো অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ অনুষ্ঠানও এবার বাতিল করা হয়েছে। তবে রীতি অনুসারে প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলা বর্ষবরণের পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছে। এটি ভার্চুয়ালি প্রকাশিত হয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আপনা-মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়’ বাণীকে এবারের বর্ষবরণের মূল প্রতিবাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পোস্টারের মূল প্রতিপাদ্যের পাশাপাশি এবার এর ব্যাখ্যাও যুক্ত করা হয়েছে। এ জন্য আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ থেকে ‘মানুষকে ধ্বংস করা যায় কিন্তু পরাজিত করা যায় না’—লাইনটি ব্যবহার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছরই আমরা পোস্টার করি। এবারও করলাম। তবে এবার এটা করা হয়েছে প্রতিপাদ্যের ব্যাখ্যাসহ। প্রতিবার প্রতিপাদ্যটি আমরা নানা মোটিভের মাধ্যমে তুলে ধরি। এবার সেটি হবে না বলে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ঋষিজসহ অন্যান্য সব সংগঠনও বর্ষবরণের অনুষ্ঠান বাতিল করেছে। চ্যানেল আই প্রতিবছর নিজস্ব প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজন করলেও এবার সে অনুষ্ঠান নেই। ধারণকৃত অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে বলে জানা গেছে।

পহেলা বৈশাখে দেশীয় নতুন পোশাক পরে, বাঙালি খাবার খেয়ে ঘুরে বেড়ানো রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে শাহবাগের আজিজ মার্কেটসহ দেশীয়

বুটিক হাউসগুলোতে রীতিমতো ভিড় থাকত এ সময়টিতে। এমনকি দরিদ্র মানুষও নতুন পোশাকের জন্য ভিড় করত ফুটপাতের দোকানগুলোতে। কিন্তু করোনার কারণে সব কিছু বন্ধ ঘোষণা করায় এবং নাগরিকদের যার যার ঘরে অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়ার কারণে আজিজ মার্কেট থেকে শুরু করে ফুটপাতে এখন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। এবার বর্ণিল পোশাক পরা প্রাণোচ্ছল মানুষের ঢল নামবে না রাজপথে, বিনোদনকেন্দ্রে কিংবা অনুষ্ঠান মঞ্চে। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে যে অর্থনীতির চাকা ঘোরে, এবার তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাহাকার বিরাজ করছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাঝে।

শান্তিবার্তা ডট কম/১৩ এপ্রিল২০২০/এসটি